আল–জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তাঁর দাবি, সামরিক সংঘাত ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের এই পর্যায়ে ইরান ‘শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে’ রয়েছে। তাই আরও দীর্ঘ সংঘাতের দিকে না গিয়ে এখনই যুদ্ধ শেষ করার সুযোগ কাজে লাগানো উচিত।
শুক্রবার চিকিৎসকদের সঙ্গে এক বৈঠকে ইরানি প্রেসিডেন্ট এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত জুনে করা সমঝোতা স্মারকের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন তিনি। ইরানের কট্টরপন্থী রাজনীতিকদের সমালোচনার জবাবে পেজেশকিয়ান দাবি করেছেন, ওই সমঝোতায় ইরান আত্মসমর্পণমূলক কোনো শর্ত মেনে নেয়নি; বরং প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিল অপর পক্ষের।
তবে প্রেসিডেন্টের এই তুলনামূলক সমঝোতামুখী বক্তব্যের বিপরীতে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব এখনো কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নতুন কোনো হামলা বা হুমকি এলে স্থল, সমুদ্র, আকাশ, বিমান প্রতিরক্ষা ও সাইবার—সব ক্ষেত্রেই পাল্টা আঘাত হানার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী।
ফলে একদিকে যুদ্ধের অবসানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের আগ্রহ এবং অন্যদিকে সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের জন্য সামরিক প্রস্তুতি—এই দুই সমান্তরাল অবস্থানেই ইরান এখন এগোচ্ছে।
‘এখনই যুদ্ধ শেষ করা ভালো’
চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান বর্তমানে এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখান থেকে যুদ্ধ শেষ করা দেশটির জন্য বেশি লাভজনক।
তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমরা এখন শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে আছি, তাই এখনই এই যুদ্ধ শেষ করা আমাদের জন্য ভালো।’
ইরানি প্রেসিডেন্ট তাঁর দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমতের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, বিশ্বজুড়ে অনেকেই মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন লঙ্ঘন করে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
পেজেশকিয়ান বলেন, ‘পুরো বিশ্ব আমাদের বিজয় স্বীকার করছে।’ তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের স্কুল, হাসপাতাল ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে এবং এ কারণে দেশটি এখন বিশ্বজুড়ে সমালোচিত ও ঘৃণিত হচ্ছে।
তবে পেজেশকিয়ানের বক্তব্যের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি ইরানের সামরিক অবস্থানকে শক্তিশালী হিসেবে তুলে ধরার বিষয়টিও স্পষ্ট। অর্থাৎ তেহরান এমন কোনো সমঝোতায় যেতে চায় না, যা দুর্বল অবস্থান থেকে আত্মসমর্পণের মতো দেখায়।
জুনের সমঝোতা নিয়ে কট্টরপন্থীদের সমালোচনার জবাব
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত জুনে করা সমঝোতা স্মারক নিয়েও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন পেজেশকিয়ান।
ইরানের পার্লামেন্টের কট্টরপন্থী সদস্যরা অভিযোগ করেছিলেন, ওই সমঝোতার মাধ্যমে পেজেশকিয়ানের সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিয়েছে। তাঁরা সমঝোতার শর্ত নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন এবং এটিকে ইরানের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন।
তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে পেজেশকিয়ান বলেন, সমঝোতার কোনো ধারাতেই ইরানের আত্মসমর্পণের কথা বলা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘এই সমঝোতার একটি ধারাও তাঁরা দেখাতে পারবেন না, যেখানে আত্মসমর্পণের কথা বলা হয়েছে; বরং সব প্রতিশ্রুতি অপর পক্ষকেই পূরণ করতে হবে।’
এর মাধ্যমে ইরানি প্রেসিডেন্ট বোঝাতে চেয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসা বা কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোকে তেহরানের দুর্বলতার প্রকাশ হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং ইরানের স্বার্থ নিশ্চিত করেই কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখা হয়েছে।
সামরিক বাহিনীর কঠোর সতর্কবার্তা
তবে সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের সামরিক নেতৃত্ব নতুন কোনো সংঘাতের জন্য প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
ইরানের গণমাধ্যম দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহির বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ইরানি বাহিনী সম্ভাব্য নতুন হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে।
স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে সামরিক অভিযান চালানোর পাশাপাশি বিমান প্রতিরক্ষা এবং সাইবার সক্ষমতাও প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
সামরিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো হুমকি তৈরি হলে তার জবাব হবে ‘বিধ্বংসী’।
এতে স্পষ্ট হচ্ছে, যুদ্ধ বন্ধের জন্য রাজনৈতিকভাবে আলোচনা ও সমঝোতার সম্ভাবনা উন্মুক্ত রাখলেও তেহরান সামরিকভাবে নিজেকে অসুরক্ষিত অবস্থায় রাখতে চাইছে না।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথকে ঘিরে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
শুক্রবার ওমান ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা টেলিফোনে কথা বলেছেন। ওমানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই মন্ত্রী কূটনৈতিক সংলাপ পুনরায় শুরুর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির বিষয়ে আলোচনা করেছেন। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতিও তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে।
ইরান গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের একটি অংশ এখনো বন্ধ রেখেছে। অন্যদিকে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধও অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে হরমুজ প্রণালি এখন শুধু সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্র নয়, বরং যুদ্ধের সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তেল পরিবহনে নতুন জটিলতা
মার্কিন গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণাংশ দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারের একটি গোপন বহর চলাচল করছে। এসব জাহাজকে মার্কিন নৌবাহিনী পাহারা দিচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এসব প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি ব্যারেল তেল রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হওয়ায় সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা যুদ্ধের অবসান আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
আলোচনায় বসতে ইরান কতটা প্রস্তুত, প্রশ্ন ট্রাম্পের
ইরানের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ শেষ করার আগ্রহ প্রকাশ করলেও দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরানের বিরুদ্ধে আরও সামরিক পদক্ষেপের সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি পরিস্থিতির পরিণতি দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি এবং এর আশপাশের স্থলভূমিসহ পুরো অঞ্চলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
তাঁর দাবি, ইরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়। তবে তাঁর মতে, তেহরান এখনো ‘সঠিক চুক্তি’ করার জন্য প্রস্তুত নয়।
ট্রাম্পের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ওয়াশিংটনও আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের চুক্তি চায়, ইরান তা মেনে নেওয়ার অবস্থানে আছে কি না—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
ইরানকে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞার হুমকি
এরই মধ্যে ইরানকে সহায়তা দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের সরকারকে ‘ধসিয়ে দেওয়া’ হবে।
এ ধরনের বক্তব্য দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। কারণ তেহরান একদিকে যুদ্ধের অবসানের কথা বলছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ফলে সামরিক সংঘাত কমিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও উভয় পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।
সামনে কী
পেজেশকিয়ানের সর্বশেষ বক্তব্যে যুদ্ধ শেষ করার রাজনৈতিক ইচ্ছার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও এর অর্থ এই নয় যে ইরান যেকোনো শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে প্রস্তুত। বরং তাঁর বক্তব্যে ‘শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান’ থেকে যুদ্ধ শেষ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের সামরিক নেতৃত্ব সম্ভাব্য নতুন হামলার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি বজায় রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রও আলোচনার সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিয়ে একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা ও চাপ বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে।
এই পরিস্থিতিতে ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশের কূটনৈতিক তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং দুই পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরানোর উদ্যোগ সফল হয় কি না, তার ওপর সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।
অর্থাৎ যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বার্তা এলেও বাস্তবে সংঘাতের অবসান এখনো নির্ভর করছে সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতার শর্ত তৈরি হওয়ার ওপর।