বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে উচ্চশিক্ষার জন্য ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে Japan। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা, গবেষণার সুযোগ, প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন সহায়তার কারণে দেশটি এখন এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় শিক্ষা গন্তব্য। তবে জাপানে পড়াশোনা করতে চাইলে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই হয় না; ভিসা, আর্থিক সক্ষমতা, অভিবাসন প্রক্রিয়া ও আবাসন নিবন্ধনসহ একাধিক ধাপ পেরোতে হয়।
জাপান সরকারের শিক্ষা–সংক্রান্ত অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্ম ‘স্টাডি ইন জাপান’-এর তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ বাধ্যতামূলক। সঠিক প্রস্তুতি না থাকলে ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার পরও জটিলতায় পড়তে হতে পারে।
যোগ্যতার সনদ: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি
জাপানে দীর্ঘমেয়াদি পড়াশোনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলোর একটি হলো ‘সার্টিফিকেট অব এলিজিবিলিটি’ বা যোগ্যতার সনদ। এই সনদ মূলত প্রমাণ করে যে আবেদনকারী জাপানে শিক্ষার্থী হিসেবে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় অভিবাসন শর্ত পূরণ করেছেন।
জাপানের আঞ্চলিক ইমিগ্রেশন সার্ভিস ব্যুরোর মাধ্যমে এ সনদের আবেদন করতে হয়। সাধারণত শিক্ষার্থী যে বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন, তারাই আবেদনকারীর প্রতিনিধি হিসেবে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। ফলে ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দ্রুত প্রতিষ্ঠানে জমা দিতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সনদ ছাড়া শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন কার্যত সম্ভব নয়। তাই জাপানে পড়াশোনার পরিকল্পনায় এটি অন্যতম প্রধান ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ বাধ্যতামূলক
জাপান সরকার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আর্থিক সামর্থ্যের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখে। কারণ, শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে যেন আর্থিক সংকটে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে চায় কর্তৃপক্ষ।
এ কারণে আবেদনকারীদের ব্যাংক সঞ্চয়পত্র, আগের বছরের আয় সনদ, স্পনসরের আর্থিক তথ্য এবং অর্থের উৎস–সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি জমা দিতে হয়। এসব নথি শিক্ষার্থীর নিজের নামে কিংবা তাঁর অভিভাবক বা আর্থিক সহায়তাদাতার নামে হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে নথির ধরন ও অর্থের পরিমাণে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। তবে সাধারণভাবে শিক্ষার্থীকে প্রমাণ করতে হয় যে তিনি জাপানে অবস্থানকালে টিউশন ফি, বাসাভাড়া, খাবার ও দৈনন্দিন ব্যয় বহন করতে সক্ষম।
শিক্ষার্থী ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
যোগ্যতার সনদ পাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ দেশে অবস্থিত জাপানি দূতাবাস বা কনস্যুলেটে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন করতে পারেন।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ভিসা আবেদনের জন্য সাধারণত যেসব নথি প্রয়োজন হয়, সেগুলো হলো—
বৈধ পাসপোর্ট
পূরণ করা ভিসা আবেদন ফরম
পাসপোর্ট সাইজের ছবি
সার্টিফিকেট অব এলিজিবিলিটি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি–সংক্রান্ত কাগজপত্র
প্রয়োজনে অতিরিক্ত সহায়ক নথি
ভিসা অনুমোদনের সময় আবেদনকারীর নথির সত্যতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং শিক্ষার উদ্দেশ্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হয়।
রেসিডেন্স কার্ড সঙ্গে রাখা বাধ্যতামূলক
জাপানে তিন মাসের বেশি সময় অবস্থানকারী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের একটি ‘রেসিডেন্স কার্ড’ বা ‘জাইরিউ কার্ড’ দেওয়া হয়। এটি মূলত শিক্ষার্থীর বৈধ বসবাসের পরিচয়পত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
যেসব শিক্ষার্থী বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে জাপানে প্রবেশ করেন, তাঁদের অনেক ক্ষেত্রে বিমানবন্দরেই ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্সের সময় কার্ড দেওয়া হয়। আর ছোট বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশকারীরা পাসপোর্টে অস্থায়ী সিল পান এবং পরে স্থানীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কার্ড সংগ্রহ করেন।
জাপানে বাসস্থান নির্ধারণের ১৪ দিনের মধ্যে স্থানীয় পৌর কার্যালয়ে গিয়ে ঠিকানা নিবন্ধন করতে হয়। দেশটিতে অবস্থানের সময় রেসিডেন্স কার্ড সবসময় সঙ্গে রাখা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক।
‘মাই নাম্বার’: প্রশাসনিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু
জাপানে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের একটি ১২ সংখ্যার সামাজিক নিরাপত্তা ও কর শনাক্তকরণ নম্বর দেওয়া হয়, যা ‘মাই নাম্বার’ নামে পরিচিত।
স্থানীয় ঠিকানা নিবন্ধনের পর এই নম্বর ইস্যু করা হয়। ব্যাংক হিসাব খোলা, কর–সংক্রান্ত কাজ, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং খণ্ডকালীন চাকরির কাগজপত্রে এই নম্বর ব্যবহৃত হয়।
জাপানে দীর্ঘমেয়াদি বসবাস ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত।
শুধু ভর্তি পরীক্ষা দিতে গেলেও লাগবে আলাদা ভিসা
যেসব শিক্ষার্থী শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে জাপানে যেতে চান, তাঁদের জন্য নিয়ম আলাদা। এ ক্ষেত্রে ‘টেম্পোরারি ভিজিটর ভিসা’ বা অস্থায়ী দর্শনার্থী ভিসার আবেদন করতে হয়।
আবেদনকারীদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ইস্যুকৃত পরীক্ষার ভাউচার বা আমন্ত্রণপত্র দেখাতে হয়। জাতীয়তা ও ভিসার ধরন অনুযায়ী এ ধরনের ভিসায় সাধারণত ১৫, ৩০ অথবা ৯০ দিন পর্যন্ত জাপানে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়।
প্রস্তুতি ও পরিকল্পনাই সফলতার চাবিকাঠি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়লেও আবেদনপ্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে নিয়মতান্ত্রিক ও কাগজপত্রনির্ভর। তাই শিক্ষার্থীদের আগে থেকেই প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখা, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং ভিসা–সংক্রান্ত সময়সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
বিশেষ করে আর্থিক কাগজপত্র, অভিবাসন প্রক্রিয়া এবং আবাসন নিবন্ধনের মতো বিষয়গুলোতে সামান্য ভুলও ভিসা বিলম্ব বা আবেদন বাতিলের কারণ হতে পারে। ফলে পরিকল্পিত প্রস্তুতির মাধ্যমেই জাপানে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।