যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উন্নত রাডার নেটওয়ার্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থামানো যাচ্ছে না। বরং যুদ্ধ শুরুর পাঁচ মাস পরও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এমন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
সম্প্রতি জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনা নতুন করে এই প্রশ্ন সামনে এনেছে—মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ফাঁক কোথায়, আর কীভাবে সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগাচ্ছে ইরান?
আল–জাজিরার এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে সামরিক বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
পাঁচ মাস পরও ইরানের হামলার সক্ষমতা অটুট
চলতি বছরের মার্চের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর থেকে ওয়াশিংটন একাধিকবার দাবি করেছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় তিন সেনার নিহত হওয়া প্রমাণ করেছে, ব্যাপক বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরান এখনো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে কার্যকর আঘাত হানতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরান শুধু নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখেনি, বরং কৌশলগতভাবেও আরও দক্ষ হয়ে উঠছে।
প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায়
লন্ডনের কিংস কলেজের স্কুল অব সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
তাঁর মতে, এসব সেনার বড় অংশ এমন সব ঘাঁটিতে অবস্থান করছেন, যেগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের কার্যকর পাল্লার মধ্যেই রয়েছে।
তিনি বলেন, অধিকাংশ ঘাঁটি মূলত রকেট, মর্টার কিংবা স্বল্পমাত্রার হামলা মোকাবিলার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক ও ভারী ওয়ারহেড বহনকারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাত প্রতিরোধ করার মতো সক্ষমতা এসব ঘাঁটির নেই।
ফলে একটি নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও বড় ধরনের প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছে।
আঘাত না লাগলেও প্রাণহানি
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি কোনো ভবনে আঘাত না করলেও তার বিস্ফোরণের তীব্র চাপ (ব্লাস্ট ওভারপ্রেশার) সেনাদের গুরুতর মস্তিষ্কে আঘাত বা ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি ঘটাতে পারে।
আবার মাঝ আকাশে প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষও নিচে পড়ে প্রাণহানি ও আহত হওয়ার কারণ হচ্ছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং প্রায় ৫০০ জন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে প্রায় ২২০টি সামরিক অবকাঠামো, ভবন ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ঢাল ভেদ করছে ইরানের নতুন কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র নয়; বরং সেগুলো ব্যবহারের কৌশলে।
ইরান একই সঙ্গে—
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র,
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র,
সশস্ত্র ড্রোন,
নকল লক্ষ্যবস্তু (ডিকয়),
একাধিক উৎক্ষেপণকেন্দ্র এবং
ভিন্ন গতি ও ভিন্ন উচ্চতায় উড়তে সক্ষম অস্ত্র ব্যবহার করছে।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ও থাড (THAAD) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর একযোগে ব্যাপক চাপ তৈরি হচ্ছে।
আন্দ্রেয়াস ক্রিগের ভাষ্য, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা গেলেও কয়েকটি যদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যায়, তাতেই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটতে পারে।
ইরানের হামলা এখন আরও নিখুঁত
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)–এর মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান মনে করেন, যুদ্ধের শুরুর তুলনায় এখন ইরানের হামলা অনেক বেশি পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক।
তাঁর মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলোয় মার্কিন সামরিক স্থাপনা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুলতা দেখাচ্ছে।
তিনি বলেন, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। যেমন—
ইরানের লক্ষ্যভেদ ক্ষমতার উন্নতি,
মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যাওয়া,
অথবা একযোগে বিপুল সংখ্যক হামলার কারণে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করতে সক্ষম হওয়া।
রাশিয়া ও চীনের সহায়তার সম্ভাবনা
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ–এর সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাফ মনে করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরান নিজেদের কৌশল আরও উন্নত করছে।
তাঁর ধারণা, রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা তথ্য কিংবা প্রযুক্তিগত সহায়তা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ করার সক্ষমতা হারিয়েছে—এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। যদিও দেশটি বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে, তারপরও তারা দ্রুত নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি নিয়ে প্রশ্ন
যুদ্ধ শুরুর পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ইরানের সামরিক শক্তি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার পর মার্কিন সিনেটে তাঁকে এ দাবি নিয়ে কঠোর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।
সিনেটর জন অসফ জানতে চান, যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহেই ইরানের সামরিক বাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে বলে যে দাবি করা হয়েছিল, তা আদৌ সঠিক ছিল কি না।
হেগসেথ অবশ্য তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তিনি দাবি করেন, ইরানের নৌ ও বিমানবাহিনী এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ইরান সম্পূর্ণভাবে হামলার সক্ষমতা হারাবে—এমন প্রত্যাশা কখনোই যুক্তরাষ্ট্র করেনি।
নতুন অস্ত্র ব্যবহার করছে ইরান
পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ও মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট–এর সিনিয়র ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল মনে করেন, ইরান যুদ্ধের শুরুতে নিজেদের সবচেয়ে উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করেনি।
তাঁর মতে, এখন ইরান ধাপে ধাপে আরও শক্তিশালী ও অধিক নির্ভুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে সক্ষম।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ইরানের সামরিক সক্ষমতার মূল্যায়নে অতিরিক্ত আশাবাদী ছিল।
সবচেয়ে বড় সমস্যা ব্যয়ের বৈষম্য
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বাথের জ্যেষ্ঠ সহযোগী অধ্যাপক এবং ন্যাটোর সাবেক গবেষণা বিশ্লেষক প্যাট্রিক ব্যুরি মনে করেন, ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা প্রযুক্তি নয়, বরং ব্যয়।
তাঁর মতে, একটি ইরানি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও উৎক্ষেপণে যে অর্থ ব্যয় হয়, সেটি ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রকে বহু গুণ বেশি ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়।
এই ব্যয়গত অসমতা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরি করছে।
লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করা নয়
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করা নয়।
আন্দ্রেয়াস ক্রিগের ভাষায়, ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর করে তোলা।
তাঁর মতে, মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে মাঝেমধ্যে কয়েকটি নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারলেই ইরান তার কৌশলগত লক্ষ্য অনেকটাই অর্জন করতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের অভিমত, বর্তমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ন থাকলেও ইরান অসম যুদ্ধের কৌশল, তুলনামূলক কম ব্যয়, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং লক্ষ্যভিত্তিক হামলার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ওপর ধারাবাহিক সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।