নিউইয়র্ক থেকে
জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে নতুন করে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি ও জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবকের ভূমিকা নিয়ে আপত্তি তুলেছে নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া।
দুই দেশের অভিযোগ, সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বেয়ারবক মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় এমনভাবে সক্রিয় হচ্ছেন, যা নিরাপত্তা পরিষদের এখতিয়ারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে প্রার্থীদের প্রকাশ্য শুনানি আয়োজন এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের কাছে তাঁর দেওয়া কিছু সুপারিশকে এখতিয়ারবহির্ভূত বলে মনে করছে ওয়াশিংটন ও মস্কো।
তবে বেয়ারবকের অবস্থান ভিন্ন। তিনি মহাসচিব নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, কাঠামোবদ্ধ, সময়োপযোগী ও বিশ্বাসযোগ্য করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর উদ্যোগকে সমর্থনকারীরা বলছেন, মহাসচিব নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত।
ফলে এবারের নির্বাচন ঘিরে মূল বিতর্ক শুধু কে পরবর্তী মহাসচিব হবেন, তা নিয়ে নয়; বরং মহাসচিব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের ক্ষমতার সীমা কতটুকু—সেই পুরোনো প্রশ্নটিও আবার সামনে এসেছে।
আপত্তি কোথায় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার?
জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনের প্রচলিত কাঠামো অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করেন এবং এরপর সাধারণ পরিষদ সেই প্রার্থীকে মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়।
এই ব্যবস্থায় নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাঁদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে।
কিন্তু এবারের প্রক্রিয়ায় সাধারণ পরিষদের সভাপতি বেয়ারবক শুরু থেকেই সাধারণ পরিষদের ভূমিকা আরও জোরালো করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি মহাসচিব পদে প্রার্থীদের জন্য প্রকাশ্য শুনানির আয়োজন করেছেন। সেখানে প্রার্থীরা নিজেদের পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন এবং বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।
এরপর অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদেরও প্রার্থীদের সম্পর্কে মতামত জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়। কূটনীতিকদের মতে, নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় এ ধরনের ব্যবস্থা এবারই প্রথম নেওয়া হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, বেয়ারবক নিরাপত্তা পরিষদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে সাধারণ পরিষদের সঙ্গে সংলাপে অংশ না নেওয়া প্রার্থীদের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার অনুরোধ করেছেন।
এই উদ্যোগই মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার আপত্তির কেন্দ্রে।
রাশিয়ার অভিযোগ
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া বেয়ারবকের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি মনে করেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বেয়ারবক যে ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তা বিতর্কিত এবং এর মাধ্যমে মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্ব ও এখতিয়ারের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
রাশিয়ার এই অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে, কারণ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে মস্কো মহাসচিব নির্বাচনে চূড়ান্তভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
রাশিয়ার আপত্তির এক দিন আগেই প্রায় একই ধরনের সমালোচনা করেছিলেন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জেনিফার লোসেটা।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ আরও তীব্র
বেয়ারবকের উদ্যোগকে সরাসরি আক্রমণ করেছেন লোসেটা। তিনি তাঁর পদক্ষেপকে এখতিয়ারবহির্ভূত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে অভিহিত করেছেন।
লোসেটার যুক্তি, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া এমন প্রার্থীদেরও বিবেচনা করতে পারে, যাঁরা সাধারণ পরিষদের কোনো সংলাপে অংশ নেননি। ফলে এ বিষয়ে সাধারণ পরিষদের সভাপতির পক্ষ থেকে নিরাপত্তা পরিষদকে পরামর্শ দেওয়া অপ্রয়োজনীয়।
এর চেয়েও কঠোর ভাষায় লোসেটা অভিযোগ করেন, বেয়ারবক নিজেকে একজন ‘কূটনৈতিক সুপারস্টার’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন এবং তাঁর পদক্ষেপের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে এমন ধারণা দেওয়া হচ্ছে যে নিরাপত্তা পরিষদ যথাযথভাবে কাজ করছে না।
তাঁর মতে, সাধারণ পরিষদের সভাপতির এমন ভূমিকা শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাজের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থাৎ ওয়াশিংটনের আপত্তি শুধু একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি নিয়ে নয়; তারা মনে করছে, সাধারণ পরিষদের সভাপতি যদি নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সক্রিয় হন, তাহলে জাতিসংঘের দুই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন বিরোধ তৈরি হতে পারে।
পুরোনো বিরোধই কি আবার সামনে?
জার্মানির সাবেক জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টোফ হয়গেন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সমালোচনাকে অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেছেন।
জার্মান টেলিভিশন চ্যানেল জেডডিএফকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, এর পেছনে মূলত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি বিরোধ কাজ করছে।
এই বিরোধের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো—মহাসচিব নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাধারণ পরিষদ কতটা সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
বর্তমান ব্যবস্থায় নিরাপত্তা পরিষদ মহাসচিব পদে একজনকে সুপারিশ করে। পরে সাধারণ পরিষদ সেই সুপারিশ অনুমোদন করে। ফলে বাস্তবে নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা সাধারণ পরিষদের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাবশালী।
তবে গত কয়েকটি মহাসচিব নির্বাচনে সাধারণ পরিষদকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। প্রার্থীদের পরিচিতি, বক্তব্য ও বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের অবস্থান প্রকাশ্যে তুলে ধরার বিষয়টি ধীরে ধীরে গুরুত্ব পেয়েছে।
বেয়ারবক সেই প্রবণতাকেই আরও এগিয়ে নিতে চাইছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেয়ারবকের লক্ষ্য কী?
জার্মানির গ্রিন পার্টির রাজনীতিক বেয়ারবক শুরু থেকেই জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনে একটি ভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য, নির্বাচন হতে হবে স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, কাঠামোবদ্ধ, সময়োপযোগী ও বিশ্বাসযোগ্য।
এই লক্ষ্য থেকেই তিনি প্রার্থীদের প্রকাশ্য শুনানির আয়োজন করেছেন। তাঁর উদ্যোগের ফলে মহাসচিব পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, নীতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে সাধারণ পরিষদের সদস্য এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে সরাসরি ধারণা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এই স্বচ্ছতার উদ্যোগই আবার নিরাপত্তা পরিষদের প্রভাবশালী সদস্যদের সঙ্গে ক্ষমতার সীমা নিয়ে বিরোধ তৈরি করেছে।
এখানেই এবারের মহাসচিব নির্বাচন আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় আলাদা মাত্রা পেয়েছে।
কীভাবে নির্বাচিত হন জাতিসংঘের মহাসচিব?
জাতিসংঘের মহাসচিবকে সরাসরি সাধারণ পরিষদের সদস্যরাষ্ট্রগুলো ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে না।
প্রথমে নিরাপত্তা পরিষদ প্রার্থীদের বিবেচনা করে। এরপর নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করে। সাধারণ পরিষদ সেই প্রার্থীকে মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়।
ফলে নিরাপত্তা পরিষদ হলো প্রার্থী বাছাইয়ের মূল কেন্দ্র, আর সাধারণ পরিষদ নিয়োগের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়।
এই ব্যবস্থার কারণে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের কেউ কোনো প্রার্থীকে ভেটো দিলে সেই প্রার্থীকে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে সাধারণ পরিষদে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। তাই সাধারণ পরিষদের ক্ষমতা বাড়ানোর যেকোনো উদ্যোগকে অনেক দেশ জাতিসংঘের বৃহত্তর প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করে।
গুতেরেসের বিদায়ের পর নতুন মহাসচিব
বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস চলতি বছরের শেষ দিকে দায়িত্ব ছাড়বেন। তাঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই জাতিসংঘ আগামী কয়েক বছরের জন্য নতুন নেতৃত্ব পেতে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবিক সংকট, শরণার্থী সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে জাতিসংঘ যখন একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন নতুন মহাসচিবের নেতৃত্বের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাই শুধু প্রার্থীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা নয়, তাঁরা নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করতে পারবেন—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হয়ে উঠতে পারে।
বেয়ারবকের পর দায়িত্ব নেবেন বাংলাদেশের খলিলুর রহমান
এদিকে বেয়ারবকের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে এক বছরের মেয়াদও শেষ হতে যাচ্ছে।
আগামী সেপ্টেম্বর থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নেবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তাঁর মেয়াদ শুরু হবে ৮ সেপ্টেম্বর এবং শেষ হবে ২০২৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর।
জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৯৯টি দেশের ভোট পেয়ে তিনি সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনে তিনি সাইপ্রাসের কূটনীতিক আন্দ্রেয়াস কাকোরিসকে পরাজিত করেন। কাকোরিস পেয়েছিলেন ৯১ ভোট।
বর্তমান সভাপতি বেয়ারবক তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, তিনি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি পেতে যাচ্ছেন।
সাধারণ পরিষদের সভাপতির ক্ষমতা কতটা?
জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় সংস্থা সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি মূলত প্রোটোকলগত হলেও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব কম নয়।
সভাপতি সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা করেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারেন। পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এ পদ থেকে সীমিত প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব।
সাধারণ পরিষদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনেক সময় বাধ্যতামূলক না হলেও আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব সিদ্ধান্তকে অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সম্মিলিত রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হয়।
এ কারণেই সাধারণ পরিষদের সভাপতি যদি মহাসচিব নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা নেন, তাহলে সেটি কেবল আনুষ্ঠানিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
খলিলুর রহমানের সামনে নতুন দায়িত্ব
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘের কার্যক্রমের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা রয়েছে।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সংস্কার, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন, নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার এবং বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার মতো বিষয়কে গুরুত্ব দিতে চান।
তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের সময়ই জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচন নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের মধ্যে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন সভাপতি হিসেবে তাঁকেও দুই সংস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে এগোতে হবে।
জাতিসংঘ সংস্কারের প্রশ্নও সামনে
বেয়ারবক জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হওয়ার আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানটির সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন।
তাঁর মতে, বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাতিসংঘকে আধুনিকীকরণ করা প্রয়োজন। দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘই এমন একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিশ্বের সব সদস্যরাষ্ট্র নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পায়—এ কথাও তিনি বলেছেন।
তাঁর এই অবস্থানের সঙ্গে মহাসচিব নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও সাধারণ পরিষদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগের একটি সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।
তবে সমালোচকেরা মনে করছেন, সংস্কারের নামে সাধারণ পরিষদের ভূমিকা বাড়াতে গিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিষ্ঠিত এখতিয়ারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলে জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বেয়ারবকের পর কী করবেন, তা এখনো অনিশ্চিত
৪৫ বছর বয়সী আনালেনা বেয়ারবক ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। এরপর তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নেন।
সাধারণ পরিষদের সভাপতির এক বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি কী করবেন, সে বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে কোনো পরিকল্পনা জানাননি।
তবে তাঁর মেয়াদের শেষ পর্যায়ে মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে যে প্রকাশ্য মতবিরোধ তৈরি হয়েছে, তা জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।
সব মিলিয়ে, গুতেরেসের উত্তরসূরি নির্বাচনের লড়াই এখন কেবল সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বনাম সাধারণ পরিষদের ক্ষমতার ভারসাম্য, মহাসচিব বাছাইয়ের স্বচ্ছতা এবং প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ সংস্কারের প্রশ্নও। ফলে আগামী মাসগুলোতে নতুন মহাসচিব কে হচ্ছেন, তার পাশাপাশি নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় কোন সংস্থার কতটা প্রভাব থাকবে—সেটিও আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।