পর্তুগাল জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে হঠাৎ চলে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে অবশেষে বিস্তারিত মুখ খুলেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা দীর্ঘ বিবৃতিতে তিনি পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। জানিয়েছেন, কোচের সঙ্গে একাধিক আলোচনার পরও দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হওয়ায় তিনি হতাশ হন এবং শেষ পর্যন্ত ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে নিজের আচরণের দায়ও এড়িয়ে যাননি পর্তুগালের অধিনায়ক। সমর্থক, সতীর্থ ও দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি বলেছেন, নিয়ম ভাঙার জন্য ফেডারেশন চাইলে তাঁকে শাস্তি দিতে পারে।
কোচের সঙ্গে শুরু থেকেই ছিল আলোচনা
রোনালদোর ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ফেডারেশনের সভাপতির সঙ্গে তাঁর আগেই আলোচনা হয়েছিল। এমনকি নতুন কোচ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তাঁর মতামত নেওয়া হয়। বর্তমান কোচের নাম প্রস্তাব করা হলে রোনালদো সেটিকে ইতিবাচকভাবেই দেখেছিলেন।
এরপর কোচের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বৈঠক হয়। সেখানে তাঁকে জাতীয় দলের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করার কথা জানানো হয়। এমনকি কোন ম্যাচে তিনি খেলবেন এবং কীভাবে তাঁর শারীরিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা হবে, সেটি নিয়েও একটি পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল।
প্রথম প্রস্তাব অনুযায়ী, নরওয়ে ও ডেনমার্ক সফরে না গিয়ে রোনালদোকে পর্তুগালে থাকার কথা বলা হয়েছিল। তবে তিনি সেটিতে রাজি হননি। তাঁর মতে, বিদেশের ম্যাচে দলের সঙ্গে না থাকাটা অধিনায়ক হিসেবে ভালো উদাহরণ তৈরি করত না।
শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত বদলানো হয় এবং রোনালদো দলের সঙ্গেই সফরে যান।
নরওয়ে ম্যাচ থেকেই শুরু হয় সমস্যা
আলভালাদে স্টেডিয়ামের ম্যাচে রোনালদো খেলেন এবং মাঠ ছাড়ার সময় নিজ হাতে ব্রুনো ফার্নান্দেজকে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরিয়ে দেন। তখনও তিনি ভাবেননি, জাতীয় দলের হয়ে তাঁর শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে।
এরপর নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের দিন তাঁকে জানানো হয়, কোচ তাঁকে প্রায় ৩০ মিনিট খেলাতে চান। রোনালদোও সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেন।
কিন্তু বিরতির পর মাঠে নামার জন্য ওয়ার্মআপ করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর খেলানো হয়নি।
রোনালদোর দাবি, এখানেই তিনি সবচেয়ে বেশি হতাশ হন। কারণ তাঁর সঙ্গে যে পরিকল্পনা ও সময় নিয়ে কথা হয়েছিল, বাস্তবে সেটি অনুসরণ করা হয়নি।
পরে বৈঠকে সমাধানের আশ্বাস
ম্যাচের পর বিষয়টি নিয়ে রোনালদো, কোচ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। তাঁর দাবি, সেই বৈঠকে কোচ স্বীকার করেছিলেন যে তাঁকে শুধু ওয়ার্মআপ করিয়ে মাঠে না নামানো ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
রোনালদোর বক্তব্য অনুযায়ী, কোচ তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে সংবাদ সম্মেলনেও তিনি একই কথা প্রকাশ্যে বলবেন এবং ঘটনাটির সেখানেই সমাপ্তি ঘটবে।
রোনালদোও বিষয়টি মেনে নেন। ঠিক হয়, ডেনমার্কের ম্যাচে তিনি খেলবেন না, তবে পরবর্তী ম্যাচে আবার দলের সঙ্গে থাকবেন।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই সমঝোতা অনুযায়ী সবকিছু হয়নি বলেই দাবি করেছেন রোনালদো।
‘এটা ছিল দ্বিতীয়বার, যখন কথা রাখা হয়নি’
রোনালদো জানান, পরবর্তী এক বৈঠকে তিনি এমন কিছু আচরণ ও বক্তব্যের মুখোমুখি হন, যা আগের দিনের আলোচনার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক ছিল।
তাঁর মনে হয়, কোচ আগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছেন। আর সেটিই তাঁকে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
রোনালদোর ভাষায়, মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সত্যি কথা বলা। কঠিন হলেও তিনি সত্য শুনতে প্রস্তুত, কিন্তু তাঁকে ভুল তথ্য দেওয়া তিনি মেনে নিতে পারেন না।
তিনি আরও বলেন, ফেডারেশন বা কোচ যদি তাঁকে জাতীয় দলে না চান, তাহলে সরাসরি জানালেই তিনি বিষয়টি মেনে নিতেন।
সমর্থকদের কাছেও চেয়েছেন ক্ষমা
ক্যাম্প ছাড়ার আগে একটি ঘটনায়ও রোনালদো নিজের ভুল স্বীকার করেছেন। ম্যাচ শেষে তিনি মাঠে থাকা সমর্থকদের অভিবাদন জানাতে যাননি।
এ নিয়ে তিনি পর্তুগালের সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। জানিয়েছেন, সেটি ছিল হতাশা থেকে নেওয়া তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত। এত বছরের জাতীয় দলের ক্যারিয়ারে সমর্থকদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও সম্মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয় বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
সতীর্থদের কাছেও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রোনালদো। তাঁর মতে, কোচের সঙ্গে সমস্যার কারণ থাকলেও দলের প্রস্তুতি চলাকালে এভাবে ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়া তাঁর করা উচিত হয়নি।
‘আমাকে শাস্তি দেওয়া উচিত’
বিবৃতির সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি ছিল নিজের শাস্তি নিয়ে রোনালদোর বক্তব্য।
তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন, ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার ঘটনায় তাঁর শাস্তি হওয়া উচিত এবং সেটি কমানোর প্রয়োজন নেই। কারণ তিনি শুধু দলের একজন খেলোয়াড় নন, পর্তুগাল জাতীয় দলের অধিনায়কও।
রোনালদোর মতে, ফুটবলে সবার জন্য নিয়ম একই হওয়া উচিত। ব্যক্তিগত মর্যাদা বা তারকা পরিচয়ের কারণে তাঁর জন্য আলাদা নিয়ম থাকা উচিত নয়।
বিদায়ী ম্যাচ নিয়েও অবস্থান পরিষ্কার
রোনালদোকে নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে—জাতীয় দলের হয়ে তাঁর জন্য বিশেষ বিদায়ী ম্যাচ আয়োজন করা উচিত কি না।
তিনি জানিয়েছেন, পর্তুগালের মানুষের জন্য ভবিষ্যতে এক বা একাধিক বিদায়ী ম্যাচ খেলার সুযোগ থাকতেই পারে। তবে জাতীয় দলের কথা ভাবলে তাঁর কাছে বিদায় অনুষ্ঠানের চেয়ে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের ক্যারিয়ারের শেষ পর্যন্ত দেশের হয়ে লড়াই করার ইচ্ছাই তাঁর বেশি।
বাবার মৃত্যুর সময়ও জাতীয় দলের সঙ্গে ছিলেন
নিজের দেশের প্রতি কতটা দায়বদ্ধ ছিলেন, সেটি বোঝাতে রোনালদো একটি ব্যক্তিগত ঘটনাও উল্লেখ করেছেন।
তিনি জানান, বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরও জাতীয় দলের ক্যাম্পে ছিলেন এবং পরের দিনের ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
তাঁর বক্তব্য, ক্লাবের ক্ষেত্রে হয়তো তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিতেন না, কিন্তু দেশের জার্সির বিষয়টি তাঁর কাছে আলাদা।
আবারও জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার অপেক্ষা
সবশেষে রোনালদো জানিয়েছেন, শারীরিকভাবে ফিট থাকলে এবং ক্লাবের হয়ে স্বাভাবিকভাবে খেলতে পারলে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর আবারও পর্তুগালের জার্সিতে মাঠে নামতে প্রস্তুত তিনি।
গোল করা, লড়াই করা এবং দেশের হয়ে জয় পাওয়ার ইচ্ছা তাঁর এখনো আগের মতোই আছে।
রোনালদোর পুরো বক্তব্যের সারকথা একটাই—তিনি নিজের ভুলের শাস্তি মেনে নিতে প্রস্তুত, কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে তাঁর দায়িত্ব ও ভালোবাসা থেকে সরে যেতে রাজি নন।