ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা বা এসআইআর বাতিলের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলন দ্বিতীয় দিনেও অব্যাহত রয়েছে। বুধবার দিল্লিতে যন্তর মন্তরে যাওয়ার পথে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী জোটের একাধিক নেতাকে আটক করেছে পুলিশ।
অশীতিপর কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেসহ বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আরও কয়েকজন নেতাকেও আটক করা হয়। এ নিয়ে টানা দ্বিতীয় দিনে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাকে আটক করল দিল্লি পুলিশ।
আটক হওয়ার আগে রাহুল গান্ধী জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তুলে বলেন, তিনি অবৈধভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদে আছেন এবং তাঁকে পদত্যাগ করতেই হবে। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে। তবে এগুলো রাহুল গান্ধী ও বিরোধীদের রাজনৈতিক অভিযোগ; নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
পুলিশের চোখ এড়িয়ে যাত্রার চেষ্টা
বুধবারের কর্মসূচি ছিল আগের দিনের তুলনায় ভিন্ন কৌশলের। বিরোধী নেতারা প্রকাশ্যে যন্তর মন্তরে যাওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা না করে কনট প্লেসের কাছে জনপথে জড়ো হন। সেখানে একটি রেস্তোরাঁয় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের আমন্ত্রণে তাঁদের মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় ও যন্তর মন্তর ওই এলাকা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। নির্ধারিত সময়ে খাড়গে, রাহুল, প্রিয়াঙ্কাসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা সেখানে জড়ো হন। তাঁদের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের ডেরেক ও’ব্রায়ান ও মহুয়া মৈত্রসহ বিরোধী বিভিন্ন দলের নেতারাও ছিলেন।
মধ্যাহ্নভোজের পর যন্তর মন্তরে গিয়ে ধরনা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এরপর দুটি বাস সেখানে আসে। বিরোধী নেতারা বাসে উঠে যাত্রা শুরু করেন।
বাস দুটি জনপথ ধরে মেরিডিয়েন হোটেলের দিকে এগোতে থাকে। পরে অশোক রোডের দিকে যাওয়ার সময় পুলিশ বাসের গতিরোধের চেষ্টা করে। কিছু দূর যাওয়ার পর পুলিশি বাধার মুখে বাস থেমে যায়।
বাস থেকে নেমে সড়কে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা
বাস থামার পর রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ অন্য নেতারা গাড়ি থেকে নেমে আসেন। তাঁদের সঙ্গে থাকা কয়েক শ কংগ্রেস কর্মীও তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এরপর তাঁরা কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে যন্তর মন্তরের দিকে হাঁটতে শুরু করেন।
পুলিশ তাঁদের আটক করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা ‘ভোটচুরি’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। পুলিশও তাঁদের আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে।
একপর্যায়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী রাস্তায় শুয়ে পড়েন। রাহুল গান্ধীও সড়কে বসে পড়েন। এরপর পুলিশ তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ সদস্যরা রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাকে তুলে গাড়িতে নিয়ে যান। ঘটনাটির ভিডিও ও ছবি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
‘১০০ এফআইআর হলেও থামব না’
আটক হওয়ার আগে রাহুল গান্ধী সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে বহু এফআইআর করা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। এ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন বলেও জানান।
রাহুলের ভাষ্য, যত এফআইআর করা হোক না কেন, তাতে তাঁর আন্দোলন থামবে না। সিইসির পদত্যাগ এবং এসআইআর বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দেন তিনি।
বিরোধীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল এবং সংশোধনের সময় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ করা নাম পুনর্বহাল।
আগের দিনও আটক হয়েছিলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা
এর আগে মঙ্গলবারও দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের কাছে বিক্ষোভের সময় রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী নেতাদের আটক করা হয়েছিল। সেদিনও তাঁরা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিরোধীদের এই ধারাবাহিক বিক্ষোভের পেছনে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিরোধী দলগুলো দাবি করছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং এর ফলে নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আরও বড় আন্দোলনের প্রস্তুতি
বিরোধী জোটের নেতারা জানিয়েছেন, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও এসআইআর বাতিলের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। একই ইস্যুতে বিভিন্ন ছাত্র ও যুব সংগঠনও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
১০ অক্টোবর যন্তর মন্তর অভিমুখে নতুন কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে বলে কপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতারা বলেছেন, পুলিশ যেখানেই আন্দোলনকারীদের আটক করবে, সেখানকেই তাঁরা প্রতিবাদের স্থান হিসেবে ব্যবহার করবেন।
বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্রসংগঠনও এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এসএফআই, এআইএসএফ, আইসা এবং আম আদমি পার্টির ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা নিয়ে শিক্ষার্থী ও বিরোধী দলগুলো নিজেদের নিজস্ব কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
ছত্তিশগড় সফর স্থগিত জ্ঞানেশের
এর মধ্যেই জ্ঞানেশ কুমারের ছত্তিশগড় সফর স্থগিত হয়েছে। বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুই দিনের সফরে তাঁর ওই রাজ্যে যাওয়ার কথা ছিল। ছত্তিশগড়ের মুখ্য নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় জানিয়েছে, ‘অনিবার্য কারণে’ সফরটি স্থগিত করা হয়েছে। নতুন তারিখ পরে জানানো হবে।
এর আগে জ্ঞানেশ কুমারের উত্তর প্রদেশের বেরিলি ও বারানসি সফরের কর্মসূচিও স্থগিত হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিক পরিবর্তনের মধ্যে ছত্তিশগড় সফর স্থগিতের ঘটনাটিও সামনে এল।
তবে সফর স্থগিতের কারণ হিসেবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অনিবার্য পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। বিরোধীদের আন্দোলনের কারণে তাঁর সফর বাতিল করা হয়েছে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য কমিশনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। ফলে দুই বিষয়কে সরাসরি এক করে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিরোধ বাড়ছে
জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগ ঘিরে দিল্লির রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়ছে। বিরোধী দলগুলো বলছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হয়নি। তারা বিষয়টি নিয়ে সংসদ ও রাজপথ—দুই জায়গাতেই চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন তাদের কার্যক্রমকে নিয়ম ও আইনের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে এবং বিরোধীদের বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দিয়েছে। বিজেপিও বিরোধীদের অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফলে সিইসির পদত্যাগ, এসআইআর