তথ্যসূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট
ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা এবং সেটিকে ধ্বংসের উদ্দেশ্যে হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত সহ-পাইলট হাম্মাম আল-হাম্মামি সম্ভবত একাই ওই ঘটনা ঘটিয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে তাঁর সঙ্গে কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন, সরকার বা অন্য কোনো সংগঠিত গোষ্ঠীর সরাসরি সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়নি বলে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
তদন্ত সম্পর্কে অবগত একাধিক মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, ২৯ বছর বয়সী হাম্মাম আল-হাম্মামি কোনো সংগঠন বা সরকারের হয়ে কাজ করছিলেন—এমন প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং প্রাথমিকভাবে তাঁকে একজন ‘লোন অ্যাক্টর’ বা একাকী হামলাকারী হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস ও এনবিসির প্রতিবেদনেও তদন্তের প্রাথমিক এই ধারণার কথা উঠে এসেছে। তবে তদন্ত এখনো চলমান থাকায় হাম্মামির উদ্দেশ্য, পূর্বপরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য যোগাযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।
তেল আবিবে বিমান বিধ্বস্তের পরিকল্পনার দাবি
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে দাবি করেছিলেন, হাম্মামি ‘ইসলামি চরমপন্থায় উদ্বুদ্ধ হয়ে’ এই হামলা চালিয়েছিলেন। এরপর ইসরায়েলি কর্মকর্তারা তাঁর সম্ভাব্য যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তদন্ত শুরু করেন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জিজ্ঞাসাবাদকারীদের কাছে হাম্মামি বলেছেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এয়ারলাইনসে চাকরি পাওয়ার আগেই তিনি হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজটি ছিনতাই করে তেল আবিবের কাছে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে আছড়ে ফেলা।
তবে এসব তথ্য এখনো তদন্তাধীন। হাম্মামির বক্তব্যের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তদন্ত নিয়ে কথা বলা মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
এর আগেও একই ধরনের পরিকল্পনার দাবি
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আরও দাবি করেছেন, চলতি বছরের শেষের দিকে হাম্মামি তেল আবিবগামী আরেকটি ফ্লাইট পরিচালনা করেছিলেন। ওই উড়োজাহাজটিকেও ছিনতাই করে বিধ্বস্ত করার ইচ্ছা তাঁর ছিল বলে কর্মকর্তারা দাবি করেন।
তবে শেষ পর্যন্ত তিনি সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন। কেন তিনি মত পরিবর্তন করেছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কর্মকর্তাদের দাবি, ওই ফ্লাইটে থাকা কোনো একজন যাত্রীকে হাম্মামি চিনতেন—এমন সম্ভাবনা তদন্তে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এই দাবির বিষয়ে স্বাধীন কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ফলে হাম্মামির আগের ফ্লাইটের পরিকল্পনা ও সেখান থেকে সরে আসার কারণ এখনো তদন্তের অংশ হয়ে আছে।
ককপিটে হামলার পর ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে যায় বিমান
ঘটনাটি ঘটে ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজে। অভিযোগ অনুযায়ী, হাম্মামি বিশেষ ধরনের একটি কুড়াল নিয়ে উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন স্মিথ মছারকে আঘাত করেন।
হামলার পর উড়োজাহাজটি হঠাৎ প্রায় ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে যায়। এতে ফ্লাইটটি নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।
ক্যাপ্টেন মছার পরে জানান, গুরুতর আহত হলেও তিনি ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর যাত্রীরা ককপিটে প্রবেশ করে সহ-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে বিমানটি স্থিতিশীল করে সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করানো হয়।
ঘটনার পর বিমানটির যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও ককপিটে সংঘটিত হামলা এবং উড়োজাহাজটিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্ত শুরু হয়।
বিভিন্ন দেশে হাম্মামির অবস্থান ও কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হচ্ছে
তদন্তকারীরা হাম্মামির অতীত কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন দেশে তাঁর অবস্থানের সময়ের তথ্যও খতিয়ে দেখছেন। অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষ দেশটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ও সেখানে অবস্থানের সময় তাঁর কর্মকাণ্ড তদন্ত করছে।
অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশের এক মুখপাত্র তদন্তের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, তাঁরা ‘উপযুক্ত সময়ে’ নতুন তথ্য জানাবেন।
বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রয়্যাল মেলবোর্ন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি জানিয়েছে, হাম্মামি কিছু সময় ওই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছিলেন। তবে তিনি সেখানে প্রকৌশল বিষয়ে কোনো ডিগ্রি সম্পন্ন করেননি।
এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটি জানিয়েছে, হাম্মামি অ্যাভিয়েশন ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে একটি দূরশিক্ষণ কোর্স করেছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ায় চরমপন্থী ওয়েবসাইটে যাতায়াতের দাবি
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস তদন্তের সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সময় হাম্মামি চরমপন্থী ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতেন। সংবাদমাধ্যমটির দাবি, অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও তাঁর নামে একটি ফাইল ছিল।
তবে হাম্মামির বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধে অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই ব্যবস্থা নিয়েছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তাঁর অনলাইন কর্মকাণ্ড ও সম্ভাব্য চরমপন্থী যোগাযোগের বিষয়টি তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হাম্মামি নিউজিল্যান্ডেও কিছু সময় অবস্থান করেছিলেন। দেশটির পুলিশও সেখানে তাঁর অবস্থান ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
ওমানে উড়োজাহাজ চালনায় নিষেধাজ্ঞার তথ্য
আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উদ্বেগের কারণে হাম্মামিকে তাঁর নিজ দেশ ওমানে উড়োজাহাজ চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।
এই তথ্য তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে ওমানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকার পরও একজন ওমানি নাগরিক কীভাবে ইসরায়েলগামী যাত্রীবাহী একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটের সহ-পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে তাঁর উড়োজাহাজ চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা কখন, কী কারণে এবং কোন কর্তৃপক্ষ দিয়েছিল—এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
সংগঠিত কোনো গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলেনি
প্রাথমিক তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো হাম্মামির সঙ্গে কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন, বিদেশি সরকার বা অন্য কোনো সংগঠিত গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ যোগাযোগের প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি বলে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এ কারণে তদন্তকারীরা আপাতত তাঁকে একাকী হামলাকারী হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে তাঁর অনলাইন কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন দেশে অবস্থান, আগের ফ্লাইটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং হামলার কথিত পরিকল্পনা—সবকিছুই আরও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্তের এসব তথ্য জানিয়েছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এবং ফ্লাইদুবাইকে এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ফলে হাম্মামির উদ্দেশ্য, তাঁর কথিত পূর্বপরিকল্পনা এবং কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড ও সম্ভাব্য যোগাযোগ সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।