আল–জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় পরপর রায় দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এসব রায়ের বেশির ভাগই গেছে ট্রাম্পের অবস্থানের বিপক্ষে। আদালতের সিদ্ধান্তে একদিকে যেমন তাঁর প্রশাসনিক ক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ভোটাধিকার, ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা, যৌন নিপীড়ন মামলা ও জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বড় ধাক্কা খেয়েছেন তিনি।
সোমবার সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প-সংশ্লিষ্ট চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রায় দেন। এর মধ্যে কেবল স্বাধীন সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের অপসারণের ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পক্ষে সিদ্ধান্ত এসেছে। বাকি বিষয়গুলোতে আদালতের অবস্থান তাঁর প্রত্যাশার বিপরীতে গেছে। মঙ্গলবারও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে দেওয়া রায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিতে বড় বাধা তৈরি হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের বরখাস্তের ক্ষমতা বাড়ল
সুপ্রিম কোর্টের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো স্বাধীন সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের অপসারণে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানো।
আদালত রায়ে বলেছে, প্রেসিডেন্ট চাইলে এসব সংস্থার সদস্যদের বরখাস্ত করতে পারবেন এবং এজন্য তাঁকে নির্দিষ্ট কোনো কারণ দেখাতে হবে না। এ সিদ্ধান্তের ফলে ১৯৩৫ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির কার্যত বাতিল হয়ে গেছে।
ওই নজিরে বলা হয়েছিল, কংগ্রেস কিছু স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের এমন সুরক্ষা দিতে পারে, যাতে প্রেসিডেন্ট ইচ্ছামতো তাঁদের অপসারণ করতে না পারেন।
ট্রাম্প গত বছর ফেডারেল ট্রেড কমিশনের (এফটিসি) ডেমোক্র্যাট সদস্য রেবেকা স্লটারকে কোনো কারণ উল্লেখ না করেই বরখাস্ত করেছিলেন। নিম্ন আদালত এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেছিলেন, এটি কংগ্রেস নির্ধারিত সুরক্ষা বিধির লঙ্ঘন।
তবে সুপ্রিম কোর্টের ৯ বিচারপতির মধ্যে ৬ জন ট্রাম্পের পদক্ষেপকে বৈধ বলে রায় দেন।
আইনজীবী ব্রুস ফেইনের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ‘নির্বাহী শাখার ওপর প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে’।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন কেন্দ্রীয় সরকারের কাঠামোতে প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এই রায় সেই প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সম্প্রসারণের জন্য এটি প্রয়োজনীয় ছিল।
তবে উদারপন্থী বিচারপতি সোনিয়া সোতোমেয়র এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, আদালত প্রায় ৯০ বছর ধরে কার্যকর থাকা একটি ব্যবস্থাকে বাতিল করে নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত সম্প্রসারণের পথ তৈরি করেছে।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেনও এই রায়ের সমালোচনা করে বলেন, ট্রাম্প স্বাধীন সংস্থাগুলোকে নিজের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছেন।
ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা রক্ষা
তবে ফেডারেল রিজার্ভের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের উদ্যোগে বাধা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
আদালত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর লিসা কুককে সরিয়ে দেওয়ার ট্রাম্পের উদ্যোগ আটকে দেন।
ট্রাম্প কুকের বিরুদ্ধে মর্টগেজ জালিয়াতির অভিযোগ তুলে তাঁকে অপসারণের চেষ্টা করেছিলেন। তবে কুক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মুদ্রানীতি নিয়ে মতপার্থক্যের কারণেই তাঁকে সরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ফেডারেল রিজার্ভ প্রতিষ্ঠার পর এর কোনো গভর্নরকে সরানোর চেষ্টা আগে কোনো প্রেসিডেন্ট করেননি।
সুপ্রিম কোর্ট রায়ে বলেছে, ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতা শুধু বাস্তবে নয়, দৃশ্যমানভাবেও বজায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত যেন ‘অনিয়মকারী ব্যক্তিদের’ হাতে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে তিনি ব্যবস্থা নেবেন।
তবে তিনি কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে চান, তা স্পষ্ট করেননি।
ডাকযোগে ভোট নিয়ে ট্রাম্পের আরেক পরাজয়
নির্বাচনের দিনের মধ্যে ডাকযোগে পাঠানো হলেও পরে পৌঁছানো ব্যালট গণনার সুযোগ বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট।
মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের একটি আইনকে চ্যালেঞ্জ করেছিল রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি। ওই আইনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের দিন ডাক বিভাগের সিল পাওয়া ব্যালট পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে পৌঁছালে তা গণনা করা যাবে।
আদালত রিপাবলিকানদের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ডাকযোগে ভোট ব্যবস্থার সমালোচনা করে আসছেন। ২০২০ সালের নির্বাচনে তাঁর পরাজয়ের পেছনেও তিনি এই ব্যবস্থাকে দায়ী করেছিলেন, যদিও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই রায়কে ভোটার অধিকারের জন্য ‘বড় ক্ষতি’ বলে মন্তব্য করেছেন।
যৌন নিপীড়ন মামলায় আপিল খারিজ
সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে লেখিকা ই. জ্যঁ ক্যারলয়ের যৌন নিপীড়ন মামলার রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনও গ্রহণ করেনি।
২০২৩ সালে নিউইয়র্কের একটি আদালত রায় দিয়েছিলেন, ১৯৯৬ সালে একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরে ক্যারলের ওপর যৌন নিপীড়ন করেছিলেন ট্রাম্প। এ ঘটনায় তাঁকে ৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ট্রাম্প অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ক্যারলের আইনজীবী রবার্টা কাপলান বলেন, সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জুরির রায় বহাল থাকল এবং ট্রাম্পের দায় এড়ানোর চেষ্টা ব্যর্থ হলো।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্বে ট্রাম্পের নীতি আটকে গেল
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার বহাল রেখেছে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বড় ধাক্কা খেল।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া কিছু শিশুর স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিন্তু আদালত বলেছে, এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে মত দিয়ে বলেন, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির অংশ।
আদালত স্পষ্ট করেছে, কোনো ব্যক্তি অবৈধ অভিবাসী হলেও বা সাময়িক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও, তাঁর সন্তান দেশটিতে জন্ম নিলে সে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার রাখবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই রায় ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির বাস্তবায়নে বড় বাধা তৈরি করবে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ
সুপ্রিম কোর্টের ধারাবাহিক এসব রায় এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। বিভিন্ন জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসে তাদের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পের অনেক নীতিগত উদ্যোগ আটকে যেতে পারে। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে রাজনৈতিক চাপও তৈরি হতে পারে।
তবে স্বাধীন সংস্থার ওপর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানো–সংক্রান্ত রায়কে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় বিজয় হিসেবে দেখছেন তাঁর সমর্থকেরা। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে।