বাংলাদেশের পোশাক ও টেক্সটাইলশিল্পের ঐতিহ্যবাহী আয়োজন ‘বাটেক্সপো’র রজতজয়ন্তী উদ্যাপন অনুষ্ঠানে দীর্ঘদিনের রেওয়াজ ভেঙে বিরোধীদলীয় নেতাকে প্রধান অতিথি করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেছেন, দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বাটেক্সপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এবং সমাপনী অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতা প্রধান অতিথি থাকেন। এবারই প্রথম সেই রীতির ব্যতিক্রম ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে জামায়াত।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) নেতাদের সাক্ষাৎ ও বৈঠক শেষে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে তিনি এ বক্তব্য দেন।
‘রাজনৈতিক ও সংকীর্ণ দলীয়করণের বার্তা যাবে’
বাটেক্সপোর আয়োজন প্রসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই বাটেক্সপোর উদ্বোধন ও সমাপনী অনুষ্ঠানে সরকার ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতির রীতি ছিল।
তাঁর অভিযোগ, এবার সেই রীতির ব্যতিক্রম করা হয়েছে। বিষয়টিকে রাজনৈতিক ও সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কোনো খাতকে রাজনীতি বা দলীয়করণের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেললে ব্যবসায়িক খাতে ভুল বার্তা যেতে পারে। তাই আয়োজকদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে বাটেক্সপোর সমাপনী অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতাকে প্রধান অতিথি করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা নিজে কখনো প্রধান অতিথি হওয়ার জন্য দাবি জানাননি। তবে বিষয়টি ব্যক্তিগত মর্যাদা বা পদ পাওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বজায় রাখার বিষয়।
‘ঐতিহ্য ভঙ্গ করা উচিত নয়’
গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক হলেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ভারসাম্য এবং পারস্পরিক সম্মানের যে চর্চা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, তা বজায় রাখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দেশের বিরোধীদলীয় রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির যে চর্চা আগে ছিল, সেটি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে পরিত্যাগ করা উচিত নয়। তাঁর মতে, কোনো সরকারই দীর্ঘদিনের এমন ঐতিহ্য ভঙ্গ করতে পারে না।
এ সময় তিনি বাটেক্সপোর কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান।
টেক্সটাইল খাতে ৩২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ
ব্রিফিংয়ে টেক্সটাইল খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরেন বিটিএমএর ভাইস প্রেসিডেন্ট শফিকুল ইসলাম সরকার। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে টেক্সটাইল খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ খাতে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে।
তিনি বলেন, টেক্সটাইল শিল্প দেশের তৈরি পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের চাহিদা পূরণ করে। সুতা, কাপড়সহ বিভিন্ন কাঁচামাল সরবরাহের মাধ্যমে এ খাত পোশাকশিল্পকে সহযোগিতা করছে।
তবে বর্তমানে টেক্সটাইল শিল্প নানা ধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। এসব সমস্যা সরকার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা চলছে বলেও উল্লেখ করেন বিটিএমএ নেতা।
গ্যাস-বিদ্যুৎ ও প্রণোদনা নিয়ে উদ্বেগ
টেক্সটাইল খাতের সমস্যাগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম সরকার বলেন, প্রণোদনা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, কর বৃদ্ধি এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ—এসব বিষয়ে শিল্প মালিকদের উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব সমস্যা নিয়মিত সরকারের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও বেশ কিছু বিষয় ইতিমধ্যে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং যেসব বিষয়ে এখনো সমাধান হয়নি, সেগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে।
বিটিএমএর পক্ষ থেকে বিরোধীদলীয় নেতাকেও এসব সমস্যার বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, প্রণোদনা ও করসংক্রান্ত বিষয়গুলোর পাশাপাশি এলডিসি থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি খাতে যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে, সেগুলো নিয়েও ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি ও নীতিগত সহায়তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
বাটেক্সপো নিয়ে জামায়াতের আগের বিবৃতি
বাটেক্সপোর রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠান সামনে রেখে গত ২৮ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামী একটি বিবৃতি দিয়েছিল। সেখানে রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও জাতীয় ঐক্য অটুট রাখার আহ্বান জানানো হয়।
ওই বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের পোশাক ও টেক্সটাইলশিল্পের ঐতিহ্যবাহী আয়োজন বাটেক্সপো শুধু একটি বাণিজ্য প্রদর্শনী নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জাতীয় পরিচয় তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ একটি মঞ্চ।
বিবৃতিতে তিনি বাটেক্সপোর আয়োজকদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক ভারসাম্যের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
জামায়াতের নেতারা উপস্থিত ছিলেন
মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনসহ দলটির কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন।
বিটিএমএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে টেক্সটাইল খাতের চলমান সংকট, সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের আলোচনার বিষয় এবং শিল্পের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়েও আলোচনা হয়। এর পাশাপাশি বাটেক্সপোর রজতজয়ন্তী আয়োজন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি নতুন করে সামনে আনেন জামায়াতের নেতারা।