যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ শহরে বাংলাদেশি রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততায় এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থকদের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক কর্মীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, পুলিশের তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৯ জুন) বিকেলে কেমব্রিজে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী জুবায়ের আহমেদ। তিনি দাবি করেন, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এবং তাঁর কয়েকজন সহযোগী তাঁকে মারধর করেন এবং একপর্যায়ে ছুরি দিয়ে আঘাতের চেষ্টা করা হয়। অভিযোগে তিনি হালকা আহত হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
তবে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠন এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্স। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি “পরিকল্পিত অপপ্রচার” এবং তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ” আনা হচ্ছে।
পুলিশের তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ
স্থানীয় পুলিশ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ঘটনার পরপরই কেমব্রিজ পুলিশ বিষয়টি তদন্ত শুরু করে। অভিযোগের ভিত্তিতে এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের এক নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে ঘটনার বিষয়ে তথ্য ও বক্তব্য জানতে হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয় বলে জানা গেছে।
তবে তদন্তের অগ্রগতি বা আনুষ্ঠানিক ফলাফল সম্পর্কে এখনো পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এক আইনজীবী জানিয়েছেন, পুলিশ প্রাথমিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করেছে এবং একাধিক পক্ষের বক্তব্য নিয়েছে।
ঘটনার পটভূমি: ভুক্তভোগীর অভিযোগ
ভুক্তভোগী জুবায়ের আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন তিনি কেমব্রিজ শহরে মোটরসাইকেলে খাবার সরবরাহের কাজ করছিলেন। এ সময় একটি গাড়ি ট্রাফিক নিয়ম ভঙ্গ করে তার সামনে আসে। তিনি প্রতিবাদ জানাতে গাড়িটিকে অনুসরণ করেন, যা থেকেই ঘটনার সূত্রপাত।
তিনি বলেন, কিছু দূর যাওয়ার পর গাড়িটি থেমে যায় এবং পরে আরেকটি গাড়িও সেখানে এসে দাঁড়ায়। এ সময় তাকে ঘিরে ফেলা হয় এবং কয়েকজন ব্যক্তি তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন।
জুবায়ের আহমেদের দাবি, হামলার সময় তিনি সাহায্যের জন্য চিৎকার করেন এবং আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তিনি আরও বলেন, হামলাকারীদের একজন ছুরি দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করে, এতে তার তলপেটে হালকা আঘাত লাগে।
ঘটনার পর একজন প্রত্যক্ষদর্শীর সহায়তায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরে পুলিশ তার বক্তব্য গ্রহণ করে অভিযোগ নথিভুক্ত করে।
রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত প্রেক্ষাপট
জুবায়ের আহমেদ নিজেকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণাগারের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি ফুড ডেলিভারি কাজও করেন। অতীতে তিনি সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও জানান।
ঘটনাটি ঘটার সময় তিনি অভিযুক্তদের পরিচয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন না বলে দাবি করেন।
পাল্টা দাবি: ‘উসকানিমূলক আচরণ’
অন্যদিকে এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্সের নেতা জাকির চৌধুরী ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, জুবায়ের আহমেদ দীর্ঘ সময় ধরে তাদের গাড়ি অনুসরণ করছিলেন। প্রায় ৩০ মিনিট ধরে তিনি তাদের পিছু নেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তারা তাকে থামিয়ে জানতে চান কেন তিনি তাদের অনুসরণ করছেন। এ সময় জুবায়ের উত্তেজিত আচরণ করেন এবং হেলমেট খুলে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন।
তিনি বলেন, “আমরা তাকে আঘাত করিনি, বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছি।” তিনি আরও দাবি করেন, পরে পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করে কোনো অপরাধমূলক প্রমাণ না পাওয়ায় তদন্ত বন্ধ করেছে।
সংগঠনের বিবৃতি ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
এনসিপি ইউকে অ্যালায়েন্স এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সংগঠনটির মতে, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা ও হয়রানির অংশ।
তারা আরও দাবি করে, যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা “ভুয়া অভিযোগ” তুলে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একটি পৃথক তদন্তের কথাও উল্লেখ করেছে, যদিও এর আনুষ্ঠানিক সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ
পুলিশের নথি অনুযায়ী, এ ঘটনায় অন্তত দুইজন প্রত্যক্ষদর্শী বক্তব্য দিয়েছেন। একজন জানান, প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়, এরপর কয়েকজন ব্যক্তি জুবায়ের আহমেদকে ঘিরে ধরে ধাক্কাধাক্কি করেন।
অন্য একজন প্রত্যক্ষদর্শী কাছের একটি ভবন থেকে ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি জানান, একাধিক ব্যক্তি একজনকে টানাহেঁচড়া করছিল এবং পরে তারা গাড়িতে উঠে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তিনি গাড়ির নম্বর প্লেটের ছবি তুলেছেন বলেও দাবি করেন।
তদন্ত ও কূটনৈতিক নজরদারি
এ ঘটনায় যুক্তরাজ্য পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে বাংলাদেশ হাইকমিশনকেও অবহিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং একজন কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে অবস্থান ও প্রেক্ষাপট
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কর্মসূচিতে অংশ নিতে গত ১৩ জুন যুক্তরাজ্যে যান হাসনাত আবদুল্লাহ। বর্তমানে তিনি দেশটিতেই অবস্থান করছেন।
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একদিকে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ, অন্যদিকে তদন্তের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের পরই এ ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।