ঢাকা

হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা, নৌযান চলাচলে ফের ধীরগতি দেখা দিয়েছে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার পর ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। শিপ ট্র্যাকিং তথ্য বলছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক বাণিজ্যিক পরিবেশের পরিবর্তে এক ধরনের অস্থির ও অনিশ্চিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সামুদ্রিক গোয়েন্দা তথ্য প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রোববার (২২ জুন ২০২৬) হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে মাত্র ১২টি জাহাজ, যা আগের দিনের ৩৫টি জাহাজের তুলনায় নাটকীয়ভাবে কম।

ট্র্যাকিং ডেটায় চলাচল হ্রাস

উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, একই দিনে প্রণালিতে প্রবেশ করা আটটি জাহাজের মধ্যে পাঁচটি তাদের অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (AIS) বন্ধ রেখেছিল, যা সাধারণত নিরাপত্তা বা ঝুঁকির কারণে করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে জানায়, বর্তমানে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি “অন্ধকার, সীমিত তথ্যপ্রবাহ এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ নৌচলাচল”–এর মতো অবস্থার সঙ্গে বেশি মিলছে, যা সাধারণ উন্মুক্ত বাণিজ্যপথের চেয়ে অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মতো।

আগের তুলনায় পরিবর্তনশীল প্রবণতা

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক সমঝোতার পর এই জলপথে জাহাজ চলাচল আবার বাড়ার লক্ষণ দেখা দিয়েছিল।

ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য বলছে, সমঝোতা ঘোষণার পরদিন বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে ২৫টি জাহাজ চলাচল করে, যা এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বোচ্চ।

এর আগে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন, যার লক্ষ্য ছিল সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত করা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো।

হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হিসেবে হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন ধরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পরিবাহিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রণালিতে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে তেলের দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থায়।

পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও সামরিক উত্তেজনা

ইরান বলেছে, ইসরায়েল লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখার কারণে হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) একে “অপরাধমূলক পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া” হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এই দাবিকে নাকচ করে জানিয়েছে, প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল অক্ষত রয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, শনিবার একদিনেই ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ ব্যবহার করেছে।

এই বিপরীতমুখী তথ্যের কারণে পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না, যা আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়াচ্ছে।

তথ্যের অসামঞ্জস্য ও অনিশ্চয়তা

সেন্টকম ও বাণিজ্যিক ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠানের দেওয়া পরিসংখ্যানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। কেন এই অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক উত্তেজনা, তথ্য গোপন রাখা এবং জাহাজ চলাচলের কৌশলগত পরিবর্তনের কারণে এমন বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

শান্তি আলোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ

এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে চলমান শান্তি আলোচনার নতুন ধাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির রোডম্যাপকে স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, উভয় পক্ষ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে একটি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছে।

তিনি বলেন, “একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা ঠিক করা হয়েছে,” যদিও এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

বাজারে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া

উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়নি। সোমবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ০.৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজার এখনো কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনার ওপর আস্থা রাখছে, যদিও পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে।

শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা

অন্যদিকে এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলো সোমবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় শুরু হয়েছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের শেয়ারবাজারে প্রধান সূচকগুলোতে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীরা আপাতত বড় ধরনের ঝুঁকি এড়িয়ে চলার কৌশল নিয়েছেন।

অনিশ্চয়তার মধ্যে ভবিষ্যৎ

হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক আলোচনা সফল না হলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে আরও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতেও।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স