আল–জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সমঝোতা প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের পর সুইজারল্যান্ডে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে দুই দেশের প্রতিনিধিরা যখন বৈঠকে বসেছেন, তখন তেহরানের ভেতরে স্পষ্ট হয়েছে নীতিগত দ্বন্দ্ব ও কৌশলগত বিভাজন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা আলী খামেনি আলোচনার ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক দায় নিজের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে সরিয়ে তুলনামূলক মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা প্রক্রিয়ার ‘রাজনৈতিক দায়ভার’ এখন সরাসরি সরকারের ওপরই পড়ছে।
নীতিগত দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার কৌশল
ইরানের কট্টরপন্থী শিবির দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের ছাড়ভিত্তিক আলোচনার বিরোধী। তাদের অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখা যাবে না এবং সামরিক ও কৌশলগত শক্তি ধরে রেখেই মোকাবিলা করতে হবে।
এ অবস্থায় খামেনির সাম্প্রতিক অবস্থান—যেখানে তিনি আলোচনার অনুমতি দিলেও নীতিগত ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন—কট্টরপন্থীদের আরও সক্রিয় করে তুলেছে। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের নমনীয়তা ইরানের অবস্থান দুর্বল করবে।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এখন কার্যত আলোচনার মূল রাজনৈতিক মুখ হিসেবে সামনে এসেছেন। ফলে তিনি একই সঙ্গে কট্টরপন্থী চাপ এবং আন্তর্জাতিক প্রত্যাশা—দুই দিক থেকেই চাপে রয়েছেন।
খামেনির অবস্থান: ভিন্নমত, তবে নিয়ন্ত্রণ ছাড় নয়
খামেনির নামে প্রকাশিত একটি লিখিত বিবৃতিতে জানানো হয়, তিনি নীতিগতভাবে সমঝোতা স্মারকের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। তবে জাতীয় নিরাপত্তা সর্বোচ্চ পরিষদকে আলোচনার দায়িত্ব এগিয়ে নিতে অনুমতি দিয়েছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হলেও ওয়াশিংটনের ‘অতিরিক্ত দাবি’ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাবে না।
তেহরানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, খামেনি শর্ত দিয়েছেন—চূড়ান্ত চুক্তির আগে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের অন্তত তিন-চতুর্থাংশ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন। যদিও এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ সদস্যই চুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারের অবস্থান: শান্তি ও বাস্তববাদী কূটনীতি
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা দেশের স্বার্থ ও ‘প্রতিরোধের নীতি’ রক্ষা করে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য যেকোনো চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সমঝোতা স্মারককে ‘ঐতিহাসিক দলিল’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এটি এমন এক বার্তা বহন করে যেখানে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ খোঁজা হয়েছে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইরান কোনো হুমকি বা চাপের বিনিময়ে তার স্বাধীনতা ও মর্যাদা ছাড়বে না।
পার্লামেন্ট ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার টানাপোড়েন
পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আলোচনাকে ‘দীর্ঘ ও কঠিন পথের সূচনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হওয়া প্রয়োজন।
তিনি দাবি করেন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কৌশলগত সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়ার জন্য নির্বাহী ক্ষমতা শক্তিশালী করা জরুরি।
কট্টরপন্থীদের প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভ
ইরানের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো সমঝোতা প্রক্রিয়াকে সন্দেহের চোখে দেখছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণসহ কৌশলগত ইস্যুগুলো চুক্তির মূল শর্ত হিসেবে থাকতে হবে, নচেৎ আলোচনা বন্ধ করতে হবে।
দেশের বিভিন্ন শহরে কট্টরপন্থী সমাবেশে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও আলোচনাকারী প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করা হচ্ছে। কেউ কেউ এমনকি রাজনৈতিক হুমকিও দিয়েছেন, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
একদিকে কট্টরপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সমঝোতার বিরোধিতা করছে, অন্যদিকে সংস্কারপন্থীরা এটিকে ‘কূটনৈতিক বিজয়ের সূচনা’ হিসেবে দেখছে। এই বিভাজন ইরানের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির কৌশলগত দূরত্ব বজায় রেখে পেজেশকিয়ানকে সামনে আনা একদিকে আলোচনার ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা, অন্যদিকে রাজনৈতিক দায় এড়ানোর কৌশলও হতে পারে।
সুইজারল্যান্ডে চলমান আলোচনার মধ্যে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এখন স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। চূড়ান্ত চুক্তির পথে অগ্রগতি হলেও তেহরানের ভেতরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও কট্টর–সংস্কারপন্থী টানাপোড়েন পুরো প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।