সুইজারল্যান্ডে শুরু হওয়া ইরান–যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনায় হরমুজ প্রণালি, জব্দ করা ইরানি সম্পদে ছাড়, লেবাননের সংঘাত এবং পারমাণবিক ইস্যুসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতার বলছে, আলোচনার প্রথম ধাপ “গঠনমূলক” হয়েছে এবং একটি চূড়ান্ত চুক্তির দিকে এগোনোর জন্য রোডম্যাপ নির্ধারণে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি” হয়েছে, বিশেষ করে জ্বালানি তেল এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা এগিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি: নিরাপদ চলাচলে যোগাযোগ ব্যবস্থা
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনায় দুই পক্ষ নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছে কাতার ও পাকিস্তান।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো এবং ভুল বোঝাবুঝি কমাতে একটি যোগাযোগ চ্যানেল চালু থাকবে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবাহিত হয়, ফলে এখানে যেকোনো অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
ইরানের দাবি: জব্দ সম্পদ ও জ্বালানি ইস্যুতে অগ্রগতি
আব্বাস আরাগচি বলেন, আলোচনায় ইরানের জব্দ করা সম্পদ ফেরত দেওয়ার বিষয় এবং তেল-সংক্রান্ত লেনদেন সহজ করার বিষয়ে “বড় অগ্রগতি” হয়েছে।
তিনি পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতাকে “অক্লান্ত প্রচেষ্টা” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই কূটনৈতিক উদ্যোগ লেবাননের সংঘাত প্রশমনে সহায়ক হতে পারে বলেও আশা করা হচ্ছে।
৬০ দিনের রোডম্যাপ: চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্য
পাকিস্তান ও কাতারের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই দেশ আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপ তৈরিতে সম্মত হয়েছে।
এই সময়সীমার মধ্যে কৌশলগত ও কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চলবে এবং প্রতিটি ইস্যু আলাদাভাবে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে।
আলোচনার প্রেক্ষাপট: যুদ্ধবিরতির পর নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ
সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর এই আলোচনা শুরু হয়েছে, যেখানে গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি ১৪ দফা কাঠামোতে সই করেন বলে মধ্যস্থতাকারী সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এর আগে সীমিত যুদ্ধবিরতি ও একাধিক দফা অস্থায়ী সমঝোতার পরও লেবাননসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত অব্যাহত থাকায় নতুন করে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
লেবানন যুদ্ধ ইস্যুতে অগ্রগতি
আব্বাস আরাগচি দাবি করেন, আলোচনায় লেবাননের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়েও “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি” হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো পক্ষই প্রকাশ করেনি।
পাকিস্তান ও কাতারের বিবৃতিতে বলা হয়, আঞ্চলিক সংঘাত প্রশমনের বিষয়টি আলোচনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
সপ্তাহজুড়ে চলবে আলোচনা
মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছেন, সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক অবকাশযাপন কেন্দ্রে পুরো সপ্তাহজুড়ে কৌশলগত আলোচনা চলবে। মূল লক্ষ্য হলো ১৪ দফা সমঝোতা কাঠামো বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো।
তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং লেবাননের সংঘাতের মতো জটিল ইস্যুগুলো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধি ও মধ্যস্থতাকারীরা
আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সঙ্গে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার।
ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তার সঙ্গে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল থানি উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইগনাজিও ক্যাসিস এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি আলোচনায় অংশ নেন।
সামগ্রিক চিত্র
প্রথম দফার আলোচনায় কিছু কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন—চূড়ান্ত চুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা এখনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে আস্থার সংকট। ৬০ দিনের রোডম্যাপ সেই সংকট কতটা কমাতে পারবে, সেটিই এখন মূল নজর।