ঢাকা

সংসদে বিদ্যুৎ–জ্বালানিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা: কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে মজুত ও অতিরিক্ত ক্রয়ে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইকবাল হাসান মাহমুদ বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে বিস্তারিত বিবৃতি দিয়েছেন। সোমবার তিনি কার্যপ্রণালি বিধির ৩০০ ধারার অধীনে নিজের মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত বিষয়ে কৈফিয়ত দিতে গিয়ে উল্লেখ করেন, পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা গেলেও এটি প্রকৃত চিত্র নয়। বরং অতিরিক্ত ক্রয় ও মজুতের প্রবণতায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

বেলা সাড়ে তিনটায় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল-এর সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। মন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু জ্বালানি খাতের নয়; এটি জাতীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উৎপাদন, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বৈশ্বিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সরকারের সময়োপযোগী প্রস্তুতি নিশ্চিত করেছে যে দেশে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।

সরবরাহ ও মজুতের পরিস্থিতি

মন্ত্রী জানান, দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ দায়িত্ব নেয়ার সময় ডিজেলের মজুত ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন, যা ৩০ মার্চে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন। এই ৪১ দিনে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হয়েছে। এছাড়া ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা সচল রাখতে সরকার জ্বালানি মজুত বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চের চাহিদার তুলনায় ২০২৬ সালের মার্চে ১০–২৫ শতাংশ বেশি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

মন্ত্রীর তথ্যমতে, চলতি বছরের ১–২৩ মার্চ পর্যন্ত অকটেন বিক্রি হয়েছে ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন, দৈনিক গড়ে ১ হাজার ২৫৮ মেট্রিক টন। মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৬৩ শতাংশ ডিজেল, অকটেন ৬.৮ শতাংশ, পেট্রল ৬.৭৭ শতাংশ।

কৃত্রিম সংকট ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা

মন্ত্রী ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনকে প্রকৃত চিত্র নয় বলে উল্লেখ করে বলেন, অতিরিক্ত ক্রয় ও মজুতের প্রবণতায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় সরকার ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করেছে, ৫৩টি মামলা করেছে এবং ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ও কারাদণ্ড দিয়েছে।

অকটেন সরবরাহ বাড়ানোর জন্য এপ্রিল মাসে ৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানি করা হবে এবং দেশীয় উৎস থেকে আরও ৩ হাজার মেট্রিক টন পাওয়া যাবে। এর ফলে মাসিক চাহিদার চেয়ে দুই মাসের অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত হবে।

মন্ত্রী উদাহরণ দিয়ে বলেন, মার্চ ২০২৬-এ তেজগাঁও ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে দৈনিক অকটেন বিক্রি বেড়েছে, যেখানে একটি মোটরসাইকেল আগে দিনে ৫ লিটার অকটেন নিত, সেখানে এখন দিনে ১৫–২০ লিটার নিচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রামে ৬ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ, জামালপুরে জরিমানা আর ময়মনসিংহে ২৪ হাজার লিটার জ্বালানি উদ্ধার হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজার ও ভর্তুকি

মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা থাকলেও বাংলাদেশে দাম বৃদ্ধি করা হয়নি। ডিজেলের বিক্রয়মূল্য ১০০ টাকা হলেও আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী ব্যয় প্রতি লিটার ১৯৪–১৯৮ টাকা। অকটেনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। মার্চ–জুন সময়ে ডিজেলে ১৫ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, অকটেনে ৬২৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

জনগণের প্রতি আহ্বান

ইকবাল হাসান মাহমুদ জনগণকে অপ্রয়োজনীয় ক্রয় ও মজুত না করতে, অপচয় রোধ করতে, অবৈধ সংযোগ ও মজুতের বিরুদ্ধে সচেতন হতে এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানান। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা, নির্দিষ্ট সময়ের পর বিদ্যুৎ ব্যবহার সংযত রাখা এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় জ্বালানি পাচারের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে বলেছেন।

মন্ত্রী সভা শেষে বলেন, “সংকট মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে—আমি নই, আমরা; ব্যক্তি নয়, দেশ; অপচয় নয়, সাশ্রয়; বিভক্তি নয়, ঐক্য—সবার আগে বাংলাদেশ।”

এই বিবৃতিতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ, কৃত্রিম সংকট ও সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংসদ ও জনগণের সামনে উপস্থাপিত হলো।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স