ঢাকা

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে তাড়াহুড়ো করতে চায় না সরকার: হুমায়ুন কবির

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কোনো ধরনের তাড়াহুড়া করতে চায় না বাংলাদেশ। দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় প্রয়োজনীয় অগ্রগতি ও সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হওয়ার পর উপযুক্ত সময়ে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

তিনি বলেছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ ইতিবাচক ও কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। তবে সেই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। কোনো দেশের সঙ্গেই জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সম্পর্ক বা সমঝোতা করতে চায় না সরকার।

শনিবার সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। গত শুক্রবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর এটিই ছিল তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভারত সফরে তাড়াহুড়া নেই

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সময়সূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, সরকারপ্রধান পর্যায়ের সফরের জন্য তাড়াহুড়া করার কোনো কারণ নেই। দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ার পরই সফরের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা হবে।

তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে দুই দেশ যদি দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, তাহলে আগামী সপ্তাহ বা তার পরের সপ্তাহেও সফর হতে পারে। আবার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ না হলে সফরের জন্য তাড়াহুড়া করারও কারণ নেই।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভাষায়, ‘‘আগামীকাল যদি আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারি, তাহলে আগামী সপ্তাহে বা তার পরের সপ্তাহেই আমরা যেতে পারি। এখানে কোনো তাড়াহুড়া নেই।’’

অর্থাৎ সফরের তারিখ নির্ধারণের চেয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয়গুলোতে বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে প্রস্তুতির ওপর জোর

হুমায়ুন কবির বলেন, সরকারপ্রধান পর্যায়ের বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের সফরের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এবং উভয় পক্ষের মধ্যে একটি কার্যকর ভিত্তি তৈরি করা দরকার।

তিনি বলেন, দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠকের আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে উভয় পক্ষকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। বাংলাদেশ বর্তমানে সেই প্রস্তুতির কাজই করছে।

তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সফরকে কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সফর হিসেবে না দেখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে অগ্রগতি আনার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে সরকার।

ভারতের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক চায় ঢাকা

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক ও কার্যকর সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘‘আমরা ভারতের সঙ্গে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক চাই। কেন চাইব না? তারা আমাদের প্রতিবেশী। আমাদের একটি কার্যকর সম্পর্ক থাকা উচিত।’’

তবে এ সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা হবে না বলে স্পষ্ট করেন তিনি।

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘‘শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, কোনো দেশের সঙ্গেই আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস করে কিছু করতে পারি না।’’

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।

যোগাযোগ অব্যাহত রাখার কথা

দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ নয়াদিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে। দুই দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক দিকে এগিয়ে নিতে কূটনৈতিক পর্যায়ে সম্পৃক্ততা বজায় রাখা হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক চায়। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে কার্যকর এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে।

প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে অর্থনীতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, সীমান্ত, পানি, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থ জড়িত। এসব বিষয়ে অগ্রগতি আনতে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সরকার।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গ

সাংবাদিকেরা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়েও জানতে চান। জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে এবং শেখ হাসিনার বিষয়টি দুই দেশের চলমান সম্পৃক্ততার অংশ।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা কয়েকটি মামলার বিচারিক কার্যক্রম ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে এবং আরও কয়েকটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে নতুন কোনো শর্ত বা নতুন ধরনের সম্পৃক্ততার বিষয় হিসেবে দেখছেন না বলে জানান তিনি। বরং এটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলমান আলোচনার একটি বিষয়।

আরও ‘অপরাধী’ ফিরিয়ে আনার দাবি

ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা এবং অন্য কথিত অপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা ও অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলেও উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির।

তিনি বলেন, শুধু শেখ হাসিনা নন, আরও অনেক অপরাধী ভারতে পালিয়ে গেছেন। তাঁদের ফিরিয়ে আনা বাংলাদেশের জনগণের স্বাভাবিক দাবি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘‘আরও অনেক অপরাধী ভারতে পালিয়ে গেছে। এটি বাংলাদেশের জনগণের স্বাভাবিক দাবি এবং তাদের অনুভূতির বিষয়। আমরা এই প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চাই।’’

এ থেকে বোঝা যায়, ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনায় প্রত্যর্পণের বিষয়টি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হবে।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের বার্তা

দায়িত্ব নেওয়ার পর হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। একদিকে তিনি প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে ইতিবাচক ও কার্যকর সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস না করার বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন।

সরকারপ্রধান পর্যায়ের সফরের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপর তাঁর জোর দেওয়ার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, ভারত সফরকে কেবল সৌজন্য সফর হিসেবে দেখছে না সরকার। বরং দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তব অগ্রগতি অর্জনের পরই এ ধরনের সফর আয়োজন করতে চায় ঢাকা।

ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত না হলেও, সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও প্রস্তুতি অব্যাহত থাকবে। আর সেই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বার্তাই দিয়েছেন নতুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স