সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা–সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক আইন নিয়ে নতুন করে বিল আনার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশোধন–সংক্রান্তসহ মোট ১৬টি অধ্যাদেশ পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন আকারে সংসদে উপস্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
রোববার (১৩ এপ্রিল ২০২৬) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এই অবস্থান তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এবং জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম।
১৬ অধ্যাদেশ নিয়ে পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত
সরকার জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১১০টি অনুমোদন পেয়েছে, ৭টি রহিত করা হয়েছে এবং ১৬টি অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সংসদে বিল আকারে উপস্থাপন না হওয়ায় কার্যকারিতা হারিয়েছে।
এই ১৬টি অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে—
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার–সংক্রান্ত একাধিক অধ্যাদেশ
দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ
তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ
আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস–সংক্রান্ত সংশোধনী অধ্যাদেশ
মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক ও ট্রাভেল এজেন্সি নিয়ন্ত্রণ–সংক্রান্ত আইন
সরকার জানিয়েছে, এসব অধ্যাদেশ আরও যাচাই–বাছাই করে নতুনভাবে বিল আকারে সংসদে আনা হবে।
বিচার বিভাগ ও কমিশন গঠন নিয়ে নতুন উদ্যোগ
সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা–সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা–সম্পর্কিত আইনগুলো নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এসব আইন নিয়ে “হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণ ও অংশীজনদের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, তবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় রেখেই আইন করতে হবে।
গুম ও মানবাধিকার কমিশন নিয়ে অবস্থান
গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ কার্যকরভাবে পাস না হওয়া নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সরকার জানায়, বিদ্যমান খসড়ায় কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। ফলে তা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, গুম সংক্রান্ত আইনের সংজ্ঞা ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অস্পষ্টতা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই আরও পরামর্শ ও আলোচনার মাধ্যমে এটি নতুন করে প্রণয়ন করা হবে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, মানবাধিকার কমিশন–সংক্রান্ত আইনও একইভাবে পুনর্মূল্যায়নের মধ্যে রয়েছে।
সংসদে না তোলার কারণ ব্যাখ্যা
সরকার জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন না করায় সেগুলো কার্যকারিতা হারিয়েছে। তবে এটি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়নি, বরং “অধিকতর যাচাই–বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কারণে” বিলম্ব হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, এসব আইন বাদ দেওয়ার অভিযোগ “ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর”। সরকারের পরিকল্পনা হলো—পর্যালোচনা শেষে আরও উন্নত সংস্করণে আইনগুলো সংসদে আনা।
বিরোধী দলের ওয়াকআউট ও বিতর্ক
সম্প্রতি সংসদে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বিল আকারে না আনার প্রতিবাদে বিরোধী দল ওয়াকআউট করে। বিশেষ করে গুম অধ্যাদেশ ও পুলিশ কমিশন–সংক্রান্ত বিল নিয়ে সমালোচনা হয়।
সরকারের দাবি, বিরোধী দলের অনেক অভিযোগ তথ্যভিত্তিক নয় এবং রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সংসদীয় রীতি অনুযায়ী বিরোধী দল ওয়াকআউট করতে পারে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাদের উপস্থাপিত তথ্য সঠিক ছিল না।”
গণভোট ও আইনগত অবস্থান
গণভোট অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানো প্রসঙ্গে সরকার জানায়, ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটের আইনি বৈধতা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি “ঘটনাক্রমে সিদ্ধ” এবং ভবিষ্যতে গণভোট করতে হলে আলাদা আইন বা সংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
তবে আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন থাকায় চূড়ান্ত ব্যাখ্যা আদালতই দেবে বলে মন্তব্য করা হয়।
পুলিশ কমিশন ও অন্যান্য সংস্কার আইন
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে পুনরায় আনার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। সরকার বলছে, এই আইনটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এটি কোনো অর্থ ব্যয় বা নতুন পদ সৃষ্টি করেনি। তাই এটি পুনর্বিবেচনা করে ভবিষ্যতে উপস্থাপন করা হবে।”
সংসদীয় প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়, সংসদে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশীজন, মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সংশোধনী গ্রহণ বা বাতিল করার ক্ষেত্রে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভূমিকা থাকে।
সরকারের মতে, কিছু অধ্যাদেশ দ্রুততার কারণে প্রণয়ন করা হলেও এখন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার আলোকে সেগুলো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সার্বিক মূল্যায়ন
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই অবস্থান মূলত বিচার বিভাগ, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন ও প্রশাসনিক সংস্কার–সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একটি পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
একদিকে আইনগুলোকে আরও “ভারসাম্যপূর্ণ ও অংশীজনভিত্তিক” করার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে বিলম্বিত সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
সার্বিকভাবে, ১৬টি অধ্যাদেশ ঘিরে সরকারের নতুন বিল আনার ঘোষণা আগামী দিনে বিচার বিভাগীয় সংস্কার, মানবাধিকার নীতি এবং প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক