সরকারের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, অদূরদর্শিতা এবং জ্বালানি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও দলীয়করণের কারণে দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতির কারণে জনদুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন, বাসাবাড়ির দৈনন্দিন কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব অভিযোগ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। একই সঙ্গে জনগণের মৌলিক ও দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে সরকার ব্যর্থ হলে এর ফলে সৃষ্ট যেকোনো পরিস্থিতির দায় সরকারকেই নিতে হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
দিনে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিংয়ের দাবি
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, সম্প্রতি দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট তীব্র হয়েছে। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহ কম থাকায় গত রোববার থেকে ব্যাপক লোডশেডিং হচ্ছে। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
বিবৃতিতে বিদ্যুৎ ঘাটতির যে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে, তাতে বলা হয়, ৯ আগস্ট দেশে ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট, ১০ আগস্ট ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট, ১১ আগস্ট ৩ হাজার ৪৬৫ মেগাওয়াট এবং ১২ আগস্ট ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।
এই হিসাবে সংশ্লিষ্ট চার দিনে গড়ে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল বলে দাবি করেছে জামায়াত।
দলটির বিবৃতিতে বলা হয়, বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহে বড় ঘাটতি
বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহেও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে দাবি করেছেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, ১২ আগস্ট দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা ছিল ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ২০৩ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি ছিল।
গ্যাসের এই সংকটের প্রভাব শিল্পকারখানায় সবচেয়ে বেশি পড়ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং শিল্প খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
একই সঙ্গে বাসাবাড়িতেও রান্নাবান্নাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের এই নেতা।
‘অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার কারণেই সংকট’
মিয়া গোলাম পরওয়ারের অভিযোগ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং সরকারের অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার কারণেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও দলীয়করণও জ্বালানি খাতের সংকটকে আরও গভীর করেছে। এসব কারণে নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে।
তাঁর মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। কিন্তু সরকার সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় সংকট বারবার ফিরে আসছে এবং এবার তা আরও তীব্র হয়েছে।
শিল্প ও শিক্ষায়ও প্রভাব
জ্বালানি সংকটের বহুমুখী প্রভাবের কথা তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
শুধু শিল্প খাত নয়, বাসাবাড়ির দৈনন্দিন কাজেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। নিয়মিত রান্নাবান্না থেকে শুরু করে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে।
বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। সব মিলিয়ে নাগরিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘জনরোষ বাড়ছে’
জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে জনমনে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেন গোলাম পরওয়ার।
এ প্রসঙ্গে তিনি দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নিরাপত্তা জোরদারের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য এ চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের মতে, বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকটকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া সরকারের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার একটি চিত্র।
তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর নিরাপত্তা চাওয়ার পেছনে ঠিক কী ধরনের পরিস্থিতি কাজ করেছে, সে বিষয়ে বিবৃতিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
নীলফামারী-কুষ্টিয়ায় সরবরাহ ঘাটতির চিত্র
বিদ্যুৎ সংকটের উদাহরণ হিসেবে দেশের বিভিন্ন এলাকার সরবরাহ পরিস্থিতিও তুলে ধরেছে জামায়াত।
বিবৃতিতে বলা হয়, নীলফামারীতে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৮০ মেগাওয়াট। কিন্তু সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।
অন্যদিকে কুষ্টিয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৫৫ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯৫ মেগাওয়াট। ফলে ওই এলাকাতেও চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
জামায়াতের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শুধু নীলফামারী বা কুষ্টিয়া নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকাতেই একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বেসরকারীকরণ নিয়েও সতর্কতা
জ্বালানি খাতের বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নিয়েও সতর্ক করেছেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর আশঙ্কা, বেসরকারীকরণের নামে পুরোনো অলিগার্কদের নতুন করে সুবিধা দেওয়া হলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট আরও গভীর হতে পারে।
তিনি বলেন, জ্বালানি খাতের সংস্কার করতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
জ্বালানি খাতের ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো ও চুরি বন্ধের দাবি
সংকট মোকাবিলায় গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে জামায়াত। পাশাপাশি শিল্প খাতে গ্যাস চুরি বন্ধ, গ্যাসের লিকেজ কমানো এবং সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গোলাম পরওয়ার।
তাঁর মতে, উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান গ্যাস ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। কারণ সরবরাহ ব্যবস্থায় চুরি, লিকেজ ও সিস্টেম লস বেশি থাকলে উৎপাদন বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ভোক্তাদের কাছে গ্যাস পৌঁছানো সম্ভব হবে না।
এ ছাড়া এনার্জি কনভার্শনের প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তেল পাচার বন্ধ ও অপরিশোধিত তেল আমদানির দাবি
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেল পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।
তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে তেল আমদানির ক্ষেত্রেও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে অপরিশোধিত তেল আমদানির ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তাঁর মতে, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বহুমুখী ও কার্যকর করতে হলে আমদানি, পরিশোধন, সংরক্ষণ ও বিতরণের প্রতিটি ধাপে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা বাড়ানোর আহ্বান
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়াতেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গোলাম পরওয়ার।
তাঁর মতে, বিদ্যুৎ খাতের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনবল ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কিংবা কারিগরি ত্রুটির কারণে যদি বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো না যায়, তাহলে সামগ্রিকভাবে সংকট থেকেই যাবে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।
তিনি বলেন, স্থলভাগে থাকা গ্যাসের রিজার্ভার ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধান ও খননের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন জরুরি।
এ কাজে সক্ষম বিদেশি অংশীদার আনার ব্যবস্থাও করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, দেশীয় সক্ষমতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের বিবৃতির মূল বক্তব্য হলো, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বর্তমান সংকটকে শুধু সাময়িক লোডশেডিং বা সরবরাহ ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাঁর মতে, উৎপাদন, আমদানি, অনুসন্ধান, বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
তিনি সরকারের প্রতি দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়ন, চুরি ও সিস্টেম লস কমানো, তেল পাচার বন্ধ এবং নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
গোলাম পরওয়ারের অভিযোগ, জনগণের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা পূরণে সরকারের ব্যর্থতার কারণেই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে এবং এর ফলে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির দায় সরকারকেই নিতে হবে।
তবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে জামায়াতের তোলা এসব অভিযোগের পাশাপাশি সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ-জ্বালানি কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ। চাহিদা-সরবরাহের ঘাটতির প্রকৃত কারণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি, গ্যাসের আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন এবং সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ—এসব বিষয় স্পষ্ট হলে বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।