বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী মার্কিন বিমানবাহী রণতরি USS Gerald R. Ford মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগ করেছে। ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও সামরিক অভিযানের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা Agence France-Presse (এএফপি) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, রণতরিটি বর্তমানে ইউরোপীয় কমান্ডের আওতাধীন এলাকায় অবস্থান করছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী নৌ উপস্থিতি বজায় রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌ উপস্থিতি
ওই কর্মকর্তার তথ্যমতে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে দুটি অন্যান্য বিমানবাহী রণতরি—USS Abraham Lincoln এবং USS George H.W. Bush—এখনো সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফোর্ডের প্রত্যাহার সাময়িক কৌশলগত পুনর্বিন্যাস হতে পারে, তবে এটি অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্যে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না।
দীর্ঘ মোতায়েন ও সামরিক অভিযান
USS Gerald R. Ford গত ১০ মাসেরও বেশি সময় সমুদ্রে মোতায়েন ছিল। এই সময়ে এটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, ক্যারিবীয় অঞ্চলসহ একাধিক সামরিক অভিযানে অংশ নেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যারিবীয় সাগরে মার্কিন বাহিনী সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারী নৌযানে অভিযান পরিচালনা করে এবং নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গকারী ট্যাংকার জব্দ করে। একই সময় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট Nicolás Maduro-এর বিরুদ্ধে একটি অভিযানের অংশ হিসেবেও ফোর্ডের ভূমিকা ছিল বলে মার্কিন সূত্র দাবি করেছে।
প্রযুক্তিগত ও অভ্যন্তরীণ সমস্যা
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ মার্চ রণতরিটির লন্ড্রি রুমে আগুন লাগে, যাতে দুই নাবিক আহত হন এবং শতাধিক বিছানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এছাড়া জাহাজটির ভেতরের অবকাঠামোগত সমস্যার কথাও উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, শৌচাগার ব্যবস্থায় ত্রুটি, টয়লেট জ্যাম হওয়া এবং দীর্ঘ সারি—এসব সমস্যা নাবিকদের দৈনন্দিন জীবনে বড় অসুবিধা তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সামরিক পরিস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বর্তমানে অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ থেমে থাকলেও কূটনৈতিক সমাধান অনিশ্চিত।
ইরান গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ Strait of Hormuz দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করে রেখেছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের বিভিন্ন বন্দরের ওপর চাপ বজায় রেখেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
কৌশলগত বিশ্লেষণ
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, USS Gerald R. Ford-এর মধ্যপ্রাচ্য ত্যাগ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলে একটি পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত হতে পারে। তবে একই সঙ্গে অঞ্চলটিতে এখনো একাধিক বিমানবাহী রণতরি উপস্থিত থাকায় উত্তেজনা কমার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।
বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে বলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
সার্বিক চিত্র
ফোর্ডের প্রত্যাহার সামরিকভাবে বড় একটি প্রতীকী পরিবর্তন হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান বহাল রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের পাল্টা অবস্থান এবং নৌপথ নিয়ন্ত্রণ ইস্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত, এবং সামগ্রিকভাবে অঞ্চলটি উচ্চমাত্রার ঝুঁকির মধ্যেই রয়েছে।