ঢাকা

জার্মান চ্যান্সেলরের সঙ্গে মতবিরোধের পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে তাদের সামরিক অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। ন্যাটো সদস্য দেশ জার্মানি থেকে প্রায় ৫ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে The Pentagon। সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে এলো যখন ওয়াশিংটন ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে ইরান যুদ্ধ নিয়ে মতবিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা Reuters জানায়, এই সেনা প্রত্যাহারকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

জার্মানির সঙ্গে মতবিরোধ থেকে সিদ্ধান্ত

সাম্প্রতিক সময়ে জার্মান চ্যান্সেলর Friedrich Merz-এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর কূটনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ইরান যুদ্ধ পরিচালনা ও কৌশল নিয়ে ইউরোপের সমালোচনার পর দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়।

চ্যান্সেলর মের্ৎস মন্তব্য করেন, ইরান যুদ্ধের কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র কার্যত চাপের মুখে রয়েছে এবং ওয়াশিংটনের কাছে এই সংঘাত থেকে বের হওয়ার সুস্পষ্ট কৌশল নেই। এই মন্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্র “অসঙ্গত ও অপ্রয়োজনীয়” বলে আখ্যা দেয়।

একজন জ্যেষ্ঠ পেন্টাগন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই ধরনের মন্তব্য মিত্রতার পরিপন্থী এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যথাযথ প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন।”

সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা ও বাস্তবতা

পেন্টাগন জানিয়েছে, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে জার্মানি থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৩৫ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে, যা ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ সামরিক উপস্থিতি।

এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা উপস্থিতি ২০২২ সালের আগের অবস্থার কাছাকাছি ফিরে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তৎকালীন প্রশাসন ইউরোপে সেনা সংখ্যা বাড়িয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান

পেন্টাগনের কর্মকর্তারা বলছেন, এই পদক্ষেপ ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও বেশি দায়িত্ব নিতে বাধ্য করার একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের “অংশীদারভিত্তিক নিরাপত্তা নীতি” থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার ইঙ্গিত দিতে পারে, বিশেষ করে যেখানে মিত্রদের অবস্থান ওয়াশিংটনের সঙ্গে একমত নয়।

ইউরোপে আরও সেনা কাটছাঁটের ইঙ্গিত

ট্রাম্প সম্প্রতি স্পেন ও ইতালিতে সেনা উপস্থিতি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রয়োজন হলে আরও দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হতে পারে।

এর আগে তিনি স্পেনের বিরুদ্ধে কঠোর বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দেন, যদি দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা না করে।

স্পেনে বর্তমানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে—Naval Station Rota এবং মোরন বিমানঘাঁটি।

ন্যাটো ও মিত্রদের সঙ্গে টানাপোড়েন

যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো মিত্রদের সমালোচনা করেছে, কারণ তারা হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখতে যথেষ্ট সামরিক সহায়তা দিচ্ছে না বলে ওয়াশিংটনের অভিযোগ।

Strait of Hormuz বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। ইরান যুদ্ধের পর এই প্রণালি কার্যত অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

ইউরোপীয় নেতৃত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনা

ইতালির প্রধানমন্ত্রী Giorgia Meloni-এর সঙ্গেও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধ দেখা দিয়েছে। ইরান যুদ্ধ এবং ভ্যাটিকান-সম্পর্কিত কিছু মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনা তৈরি হয়।

ট্রাম্প অভিযোগ করেন, কিছু ইউরোপীয় নেতা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করছে।

কৌশলগত বিশ্লেষণ

বিশ্লেষকদের মতে, জার্মানি থেকে ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহার কেবল একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কের মধ্যে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক দূরত্বের প্রতিফলন।

ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ মতভেদ—সব মিলিয়ে পশ্চিমা জোটের মধ্যে একটি নতুন কূটনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি

বর্তমানে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশল পুনর্গঠন করছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স