ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সরকার আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, গুজব বা ভুয়া তথ্য ছড়ানো একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও অনেকেই বিষয়টি উপলব্ধি করেন না। এটি নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন নয়, তবে কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো দরকার। সেই লক্ষ্যেই সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর শান্তিনগর এলাকার সার্কিট হাউস রোডে অবস্থিত প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সেমিনার কক্ষে আয়োজিত এক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। “গণমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য: কে শিকার, কে শিকারি?” শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পিআইবি।
জাহেদ উর রহমান বলেন, একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। একই সঙ্গে ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে এমনভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষ নিশ্চিত হতে পারে—অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গুজব ছড়ানোর সঙ্গে বৈশ্বিক ডানপন্থী রাজনীতির একটি সম্পর্ক রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এ সমস্যা তুলনামূলকভাবে বেশি প্রকট, কারণ এখানে গণমাধ্যম ও ডিজিটাল জ্ঞান এখনো সীমিত।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, গত ১৬ বছরে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রভাব এখনো রয়েছে। দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার কারণে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতা সমাজে গেঁড়ে বসেছে, যার প্রভাব গণমাধ্যমেও পড়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে নিয়োগ পাওয়া কিছু গণমাধ্যমকর্মী নিরপেক্ষতার বাইরে গিয়ে বিশেষ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করেছেন, যা ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রবণতাকে উৎসাহিত করেছে। তাই সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা অবনতি হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি বর্তমান সরকারের কারণে হয়নি; বরং পূর্ববর্তী সময়ের ধারাবাহিকতার ফল। ভবিষ্যতে এ সূচকে উন্নতি হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুসান ভাইজ। তিনি বলেন, ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে তথ্য যাচাই কার্যক্রম বাড়াতে হবে এবং সাংবাদিকদের দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ-আল মামুন বলেন, বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে গুজব ছড়ানোর সম্পর্ক রয়েছে এবং বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে এ প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তাঁর মতে, গুজবের পেছনে প্রায়ই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করে।
সাংবাদিক ও শিক্ষক নাজিয়া আফরিন মনামী বলেন, ভুয়া তথ্য ছড়ানো একটি কাঠামোগত সমস্যা, যার পেছনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত একটি গবেষণাপত্রে জানানো হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে গুজব ছড়ানোর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় এ প্রবণতা বাড়ে এবং ফেসবুকসহ অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে এসব তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সভাপতির বক্তব্যে পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, অনেক সময় প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠান ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হয়। তাই তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
আলোচনায় আরও অংশ নেন বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি ও তথ্য যাচাই বিশেষজ্ঞরা।