গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকট নিরসনে রাজপথে আন্দোলন ও লংমার্চের কর্মসূচি দেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় সংসদে বিকল্প পরিকল্পনা ও পরামর্শ দিতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বাধা এবং বিগত সরকারের ভুল পরিকল্পনার প্রভাব রয়েছে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় শুধু সরকারের সমালোচনা বা রাজপথে কর্মসূচি না দিয়ে কীভাবে এই সংকটের সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে বিরোধী দলকে বাস্তবসম্মত বিকল্প প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শুক্রবার বিকেলে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রিজভী এসব কথা বলেন।
‘লংমার্চ করবেন, ঠিক আছে—অল্টারনেটিভ বলুন’
গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, আন্দোলন বা লংমার্চ করার অধিকার বিরোধী দলের রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি সংকট সমাধানের বিকল্প পথও তাদের সামনে আনতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আপনারা গ্যাস, বিদ্যুতের জন্য লংমার্চ করবেন, কর্মসূচি দেবেন—ঠিক আছে। কিন্তু আপনারা একটা অল্টারনেটিভ (বিকল্প উপায়) বলুন, আমরা গ্যাস ও বিদ্যুৎ কীভাবে সরবরাহ করব, কোথা থেকে পাব, কীভাবে পাব।’
রিজভীর মতে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু সরকারের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকা নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সে বিষয়ে সংসদে আলোচনা ও কার্যকর পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের কথা বলার সুযোগ রয়েছে। সরকারের সমালোচনা করা এবং সংসদের বাইরে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চা। তবে একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সংকট সমাধানে বিকল্প পরিকল্পনা ও পরামর্শ দেওয়াও প্রয়োজন।
‘পরিকল্পিত অচলাবস্থা তৈরি করা ঠিক হবে না’
রুহুল কবির রিজভী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটকে কেন্দ্র করে এমন কোনো কর্মসূচি নেওয়া উচিত নয়, যার ফলে দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রম আরও ব্যাহত হয়।
তিনি বলেন, ‘একটা পরিকল্পিত অচলাবস্থা তৈরি করা আমার মনে হয় ঠিক হবে না; বরং কীভাবে এই সংকট নিবারণ করা যায়, সেই বিষয়ে পরিকল্পনা দিতে হবে।’
অতীতের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হলে দেশ আরও অন্ধকারের দিকে চলে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
রিজভীর বক্তব্যে সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ভূমিকার বিষয়টিও উঠে আসে। তাঁর মতে, সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার পাশাপাশি বিরোধী দলেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রস্তাব থাকা দরকার।
‘হরমুজ প্রণালির কারণে জ্বালানি আমদানিতে সংকট’
দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা।
রিজভী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বাধার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তাঁর ভাষ্য, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায়ও এর প্রভাব পড়ছে।
তিনি দাবি করেন, বর্তমান সংকট সরকারের নিজস্ব কোনো কারণে তৈরি হয়নি। একই সঙ্গে বিগত সরকারের ভুল পরিকল্পনারও সমালোচনা করেন তিনি।
জুলাই আন্দোলনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভূমিকা
শিল্পকলা একাডেমিতে নৃত্যশিল্পীদের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় জুলাই আন্দোলনে গান, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন রিজভী।
তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা আন্দোলনকারীদের মধ্যে উদ্দীপনা ও সাহস তৈরি করেছিল। গান, নৃত্যসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের মধ্যে প্রতিবাদের চেতনা জাগিয়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রিজভী বলেন, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
মেয়েদের সমান অংশগ্রহণ না হলে দেশ পিছিয়ে যাবে
এর আগে শুক্রবার সকালে বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত আন্তবিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৬ বালিকা ফুটবল প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন রুহুল কবির রিজভী।
সেখানে তিনি বলেন, খেলাধুলাসহ সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে দেশ ও সমাজ পিছিয়ে যাবে।
রিজভী বলেন, ‘আমরা জানি যে আমাদের সমাজে অনেক বাধা আছে। কিন্তু পৃথিবীর প্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে আমাদের মেয়েদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে খেলাধুলার সেক্টরে।’
তিনি বলেন, কোনো নারী যদি খেলাধুলায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন, তাহলে তা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করে। একই সঙ্গে অন্য খাতের নারীদেরও এগিয়ে যেতে তা উৎসাহিত করে।
রিজভীর ভাষায়, ‘মেয়েদের মধ্যে যদি আমরা একজন শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদ পাই, তাহলে বিশ্বের দরবারে আমাদের মাথা উঁচু করে দেয়। অন্যান্য সেক্টরের নারীদেরও উজ্জীবিত করে।’
‘প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষকে সমানভাবে এগিয়ে যেতে হবে’
নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, দেশের উন্নয়নের জন্য সব ক্ষেত্রেই নারী ও পুরুষকে সমানভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, নারীদের বাদ দিয়ে কোনো সমাজ টেকসইভাবে এগিয়ে যেতে পারে না। খেলাধুলায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
রিজভী বলেন, ‘প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষকে সমানভাবে এগিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় দেশ পিছিয়ে যাবে।’
নারীদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিযোগিতা আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
‘যোগ্য ব্যক্তিকে সম্মান দেখাতে হবে’
রিজভী বলেন, যোগ্যতা ও প্রতিভার যথাযথ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। মেয়েদের খেলাধুলায় আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে মহানগর ও জেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা উচিত।
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টি জোরালোভাবে অনুধাবন করেছেন। এ জন্য তিনি নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস করেছেন। যে যোগ্য তাকে সম্মান দেখাতে হবে। প্রতিটি মহানগর, জেলায় জেলায় এ ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে।’
বাংলাদেশে একটি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা। তাঁর মতে, ক্রীড়াক্ষেত্রে দক্ষতা ও জ্ঞানকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে নিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
‘মেয়েদের খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি সারওয়াত সিরাজ স্বাগত বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মেয়েদের খেলাধুলায় আরও বেশি সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সামাজিক অগ্রগতির পথ সুগম করা সম্ভব। তাঁর বক্তব্যে উগ্র রক্ষণশীলতা, ধর্মান্ধতা এবং ‘জান্নাতের টিকিট বিক্রয়কারী’ শক্তির বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গও উঠে আসে।
সারওয়াত সিরাজ বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা এই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
নৃত্যশিল্পী সংস্থার অভিষেক অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন
বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভাপতি ফারহানা বেবীর সভাপতিত্বে নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, বিএনপির সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন উজ্জল, কবি রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন, অভিনেতা হেলাল খান, জাকির হোসেন রুকনসহ আরও অনেকে।
অনুষ্ঠানে নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে অভিষেক করানো হয়।
একই দিনে দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে রিজভীর আলোচনায় উঠে আসে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ–সংকট, বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, সংস্কৃতির ভূমিকা এবং খেলাধুলায় নারীর অংশগ্রহণের বিষয়। একদিকে সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি, অন্যদিকে দেশের সামাজিক ও ক্রীড়া উন্নয়নে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।