বরিস পিস্টোরিয়াস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র–এর প্রায় পাঁচ হাজার সেনা জার্মানি থেকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি আগেই “অনুমান করা যাচ্ছিল”। তিনি বলেন, ইউরোপে বিশেষ করে জার্মানিতে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি উভয় দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জার্মান বার্তা সংস্থা ডয়চে প্রেসে-আজেন্টুর–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিস্টোরিয়াস মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরেই এর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। তিনি ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।
এদিকে সামরিক জোট ন্যাটো জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে যুক্তরাষ্ট্র–এর সঙ্গে কাজ করছে। ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট বলেন, ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের পেছনের কৌশলগত ব্যাখ্যা তারা জানতে চাইছে এবং বিষয়টি নিয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে।
বর্তমানে জার্মানিতে ৩৬ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি। পাশাপাশি ইতালি–তে প্রায় ১২ হাজার এবং যুক্তরাজ্য–এ প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি হ্রাসের ইঙ্গিত ন্যাটোর ভেতরে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং রাশিয়ার সম্ভাব্য হুমকি নিয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে চাপ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল এক বিবৃতিতে জানান, প্রত্যাহার কেবল পাঁচ হাজার সেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভবিষ্যতে আরও সেনা কমানো হতে পারে। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি।
এর আগে গত বছর রোমানিয়া থেকেও কিছু মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কৌশলে পরিবর্তন এনে ইউরোপ থেকে মনোযোগ সরিয়ে ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলে জোর দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তবে এই সিদ্ধান্তে ন্যাটোর ৩২ সদস্যদেশের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ডোনাল্ড টাস্ক মন্তব্য করেছেন, জোটের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বাইরের শক্তি নয়, বরং অভ্যন্তরীণ বিভাজন।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই জ্যেষ্ঠ রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা সিনেটর রজার উইকার এবং প্রতিনিধি মাইক রজার্সও ইউরোপে শক্তিশালী মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন।
জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিস্টোরিয়াস বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় ইউরোপকে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি গ্রহণ করতে হবে। তিনি মনে করেন, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, জার্মানি প্রতিরক্ষা ব্যয়ে দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করছে না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানি তার প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়েছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী জার্মানির মোট প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক সহায়তাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর যে অঙ্গীকার করেছে, তা বাস্তবায়নের পথে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। তিনি গত দ্য হেগ সম্মেলনে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প ও জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস–এর মধ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনার পরই সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে। মের্ৎস অভিযোগ করেছিলেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল স্পষ্ট নয় এবং আলোচনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন।
পেন্টাগনের মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা সচিবের নির্দেশ অনুযায়ী আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমলে ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, যা বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করবে।