ঢাকা

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়ন: বিচারহীনতার চিত্র উঠে এলো এইচআরডব্লিউ প্রতিবেদনে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের দুই বছর পার হলেও এখনো কোনো বিচার বা কার্যকর জবাবদিহি হয়নি বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা Human Rights Watch (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে আরাকান আর্মির চালানো হামলায় শত শত রোহিঙ্গা নিহত বা নিখোঁজ হন, যাদের অনেকেই এখনো কোনো প্রতিকার পাননি।

প্রতিবেদনটি সোমবার থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থেকে প্রকাশ করা হয়।

হোইয়ার সিরি গ্রামে হত্যাযজ্ঞ

এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ২ মে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুথিডং এলাকার হোইয়ার সিরি গ্রামে। ওই দিন সশস্ত্র গোষ্ঠী Arakan Army নিরস্ত্র রোহিঙ্গা গ্রামবাসীর ওপর গুলি চালায়। এতে বহু মানুষ নিহত হন এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান।

বেঁচে যাওয়া অনেকেই পরবর্তীতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেন। প্রায় এক বছর পর ঘটনাটির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসে।

৫৬ পৃষ্ঠার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

‘স্কেলেটনস অ্যান্ড স্কালস স্ক্যাটার্ড এভরিহোয়ার: আরাকান আর্মি ম্যাসাকার অব রোহিঙ্গা মুসলিমস ইন হোইয়ার সিরি, মিয়ানমার’ শিরোনামের ৫৬ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনটি বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট ইমেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত যাচাইকৃত ভিডিও ও ছবির বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে এসে ঘটনার ভয়াবহ বিবরণ দিয়েছেন।

১৭০ জনের বেশি নিহত বা নিখোঁজ

এইচআরডব্লিউর হিসাব অনুযায়ী, ওই গ্রামে অন্তত ১৭০ জনের বেশি রোহিঙ্গা নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৯০ জন শিশু রয়েছে। তবে সংস্থাটি বলছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বেসামরিক মানুষের ওপর ইচ্ছাকৃত গুলি, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, বেআইনি আটক এবং নির্যাতনের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।

‘সাদা পতাকা’ তুলেও রক্ষা পাননি অনেকে

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার সময় অনেক গ্রামবাসী সাদা পতাকা তুলে আত্মসমর্পণের চেষ্টা করলেও তাদের ওপর গুলি চালানো হয়।

একজন বেঁচে ফেরা ব্যক্তি বলেন, “প্রথমে আমার ছেলেকে গুলি করা হয়, এরপর আমার স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে হত্যা করা হয়। শেষে আমার আরেক মেয়েকেও গুলি করা হয়।”

অন্য এক নারী জানান, মসজিদের পাশে ধানখেতে জড়ো করা গ্রামবাসীদের ওপর খুব কাছ থেকে গুলি চালানো হয়। তার ভাষায়, “কাউকেই রেহাই দেওয়া হয়নি।”

আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের অভিযোগ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, Arakan Army বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিত হামলা, সম্পত্তি ধ্বংস এবং গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত ছিল।

একই সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে এবং বেসামরিক জনগণকে সুরক্ষা দিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এইচআরডব্লিউর মতে, এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুদ্ধকালীন আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।

জোরপূর্বক সাক্ষ্য ও প্রচারণার অভিযোগ

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আরাকান আর্মি পরে ভুক্তভোগীদের কিছু অংশকে জোর করে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করে। ২০২৪ সালের আগস্টে তাদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা এলাকায় গিয়ে এসব ‘মিথ্যা বয়ান’ ভিডিও ধারণ করে প্রচার করে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

নতুন করে সংঘাত ও মানবাধিকার সংকট

২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যে পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হয়। এরপর থেকে দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই বেসামরিক জনগণের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও জোরপূর্বক নিয়োগের অভিযোগ বাড়তে থাকে।

এইচআরডব্লিউর প্রতিক্রিয়া

সংস্থাটির এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক Minnie Ganguly বলেন, রাখাইনে বেসামরিক রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। তাঁর মতে, এখনো বেঁচে থাকা মানুষরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে এবং দায়ীদের কোনো জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি।

বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া

বিশ্লেষকদের মতে, এই হত্যাযজ্ঞের দুই বছর পরও কোনো আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় বিচার প্রক্রিয়া না থাকায় রোহিঙ্গাদের দুর্দশা আরও গভীর হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো দ্রুত স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে রাখাইন রাজ্যের মানবিক সংকট এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স