কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন থেকে তেহরানের হাতে থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের প্রধান আলোচক ও সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ অবসানের আলোচনার পর তিনি এ মন্তব্য করেন।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনার পর এমন ঘোষণা আসে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
সুইজারল্যান্ডে যুদ্ধবিরতি আলোচনার পর ঘোষণা
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইরনার বরাত অনুযায়ী, গত রোববার সুইজারল্যান্ডের বিলাসবহুল বার্গেনস্টক অবকাশকেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়। মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছেন, আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল চলমান সংঘাত প্রশমন এবং গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ইস্যুতে সমঝোতা তৈরি করা।
আলোচনায় হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা, লেবাননে ইসরায়েল–হিজবুল্লাহ সংঘাত বন্ধ এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মতো বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসে।
গালিবাফের কড়া ঘোষণা
আলোচনার পর দেশে ফিরে গালিবাফ বলেন, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ এখন থেকে তেহরানের হাতে থাকবে।
তিনি বলেন, “হরমুজ প্রণালি আর কখনো যুদ্ধ–পূর্ব অবস্থায় ফিরবে না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি এখন থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।”
তিনি আরও দাবি করেন, সুইজারল্যান্ডের আলোচনা থেকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে এবং এটি একটি ইতিবাচক সূচনা।
নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও তহবিল ছাড়ের ইঙ্গিত
গালিবাফ নিজের টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে দেওয়া ভিডিও বার্তায় বলেন, আলোচনায় তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল, আটকে থাকা তহবিল মুক্তি এবং লেবানন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমার দৃষ্টিতে এই সফর থেকে ভালো কিছু অর্জন সম্ভব হয়েছে। তবে এটি কেবল শুরু, আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য ও পারমাণবিক ইস্যু
বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, আলোচনার অংশ হিসেবে ইরান তাদের দেশে জাতিসংঘের পারমাণবিক পরিদর্শকদের পুনরায় প্রবেশের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে।
এছাড়া, আলোচনার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা সমঝোতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উভয় পক্ষ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে একটি সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছেন, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো সম্ভব হবে।
প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বর্তমান পরিস্থিতি
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি আলোচনার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমে এই নৌপথ বন্ধ করা হয়েছিল, পরে সমঝোতার ভিত্তিতে আবার খুলে দেওয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর আবারও সীমিত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে বলে জানা যায়।
ভূরাজনৈতিক প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এমন ঘোষণা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়, ফলে অঞ্চলটির যে কোনো অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনার ফলাফল এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে রয়েছে।