পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ব্যবহার করে গঠিত একটি পৃথক গোষ্ঠীর নতুন কমিটি ঘোষণা ও নেতৃত্ব–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে গঠিত এই কমিটি নিয়ে দলীয় রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার (২২ জুন) পূর্ব কলকাতার নিউ টাউনের একটি বেসরকারি হোটেলে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
১১ সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানায়, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ১১ সদস্যের একটি নতুন জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি হিসেবে সাবেক মন্ত্রী ও বিধায়ক অরূপ রায়কে মনোনীত করা হয়েছে।
এছাড়া বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে দলের বর্তমান নেতৃত্ব কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে এবং পূর্বের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাময়িক বরখাস্তের দাবি
বৈঠকে আরও দাবি করা হয়, তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সংগঠন থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, উপস্থিত নেতারা প্রস্তাবটি অনুমোদন করেন এবং সেটিকে নতুন কমিটির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বৈঠকে উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ
বৈঠকে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন সাবেক ও বর্তমান কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী জাভেদ খান, অরূপ রায়সহ একাধিক স্থানীয় ও নগর পর্যায়ের নেতা।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, পুরো আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও প্রতীক ব্যবহার করেই। তবে বৈঠকস্থলে দলের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো ছবি রাখা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বিভাজনের ইতিহাস
সূত্রগুলো বলছে, গত কয়েক বছরে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে একাধিক রাজনৈতিক বিভাজন ও ভাঙনের ঘটনা ঘটেছে। এর ধারাবাহিকতায় রাজ্য বিধানসভায় একসময় ৫৮ জন বিধায়ক দল ছাড়েন এবং লোকসভায়ও ২০ জন সংসদ সদস্য দলত্যাগ করেন।
পরবর্তীতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি পৃথক রাজনৈতিক শিবির গড়ে ওঠে, যারা নিজস্ব সংগঠন কাঠামো তৈরি করে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে।
আদালতে চ্যালেঞ্জ ও আইনি প্রক্রিয়া
নতুন গোষ্ঠীর উত্থানের পর তৃণমূল কংগ্রেসের মূল নেতৃত্ব আদালতের দ্বারস্থ হয়। তাদের অভিযোগ ছিল, দলীয় প্রতীক ও নাম ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে।
তবে কলকাতা হাইকোর্ট স্পিকারের সিদ্ধান্তের ওপর কোনো অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয়নি। আদালত বিষয়টি আপাতত বহাল রাখলেও আগামী জুলাই মাসের শেষে এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেছে।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন কমিটি গঠন পশ্চিমবঙ্গের দলীয় রাজনীতিতে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে নেতৃত্বের বৈধতা, দলীয় প্রতীক ব্যবহার এবং সাংগঠনিক কর্তৃত্ব নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আরও বাড়তে পারে।
এদিকে নতুন শিবিরের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সূত্রের দাবি, লোকসভা পর্যায়ে এই গোষ্ঠীর কিছু সদস্য ইতোমধ্যে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যোগ দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে ভিন্ন অবস্থান নিতে পারেন।
সব মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে ঘিরে এই নতুন কমিটি ঘোষণা ও নেতৃত্ব–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন বিভাজন ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। দলীয় পরিচয়, প্রতীক এবং নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে চলমান এই দ্বন্দ্ব আগামী দিনে আদালত ও রাজনৈতিক মঞ্চ—দুই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।