ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা স্যার কিয়ার স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। সোমবার দেওয়া এক দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় নেতৃত্ব—উভয় পদ থেকেই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জানান। বক্তব্যে তিনি নিজের রাজনৈতিক যাত্রা, অর্জন, দলের রূপান্তর এবং ব্যক্তিগত অনুভূতি তুলে ধরেন।
‘এটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত’
বক্তব্যের শুরুতেই স্টারমার বলেন, দুই বছর আগে লেবার পার্টির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম গর্বের মুহূর্ত।
তিনি বলেন, “ধন্যবাদ। সবাইকে ধন্যবাদ। দুই বছর আগে এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত।”
তিনি স্মরণ করেন, ১৪ বছর পর লেবার সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, যা দেশকে হতাশা ও নৈরাশ্য থেকে বের করে আনার সুযোগ তৈরি করেছিল।
লেবার পার্টির ‘পুনর্গঠন’ ও সংকট থেকে উত্তরণ
স্টারমার বলেন, তিনি যখন লেবার পার্টির দায়িত্ব নেন, তখন দলটি রাজনৈতিক, আর্থিক ও নৈতিক সংকটে ছিল।
তার ভাষায়, “ছয় বছর আগে যখন আমি দায়িত্ব নিই, দলটি দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। আমাদের বলা হয়েছিল, লেবার পার্টি শেষ।”
তিনি দাবি করেন, দলকে পুনর্গঠন করাই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য, এবং সেই প্রক্রিয়ায় তারা সমালোচনাকে ভুল প্রমাণ করেছে।
ইহুদিবিদ্বেষ দূর ও আস্থা পুনরুদ্ধারের দাবি
স্টারমার বলেন, তাঁর নেতৃত্বে লেবার পার্টি থেকে ইহুদিবিদ্বেষ দূর করা সম্ভব হয়েছে এবং অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা গেছে।
তিনি বলেন, দলটি এখন আবার জাতীয় পতাকার পাশে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।
সরকারের অর্জন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা
বিদায়ী ভাষণে স্টারমার তাঁর সরকারের বিভিন্ন অর্জনের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, গত দুই বছরে—
যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে এবং দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে
মানুষের আয় মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে দ্রুত বেড়েছে
স্বাস্থ্যসেবা খাতে দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকা কমানো হয়েছে
অবকাঠামো উন্নয়নে বড় অগ্রগতি হয়েছে
শ্রমিক ও ভাড়াটেদের অধিকার সম্প্রসারিত হয়েছে
প্রতিরক্ষা খাতে স্নায়ুযুদ্ধ–পরবর্তী সর্বোচ্চ ব্যয় নিশ্চিত করা হয়েছে
তিনি আরও বলেন, অবৈধ অভিবাসন কমানো, সামাজিক মাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষা এবং দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে।
বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান
স্টারমার বলেন, তাঁর নেতৃত্বে যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, দেশটি আবারও ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে, ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি করেছে।
নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ও পদত্যাগের সিদ্ধান্ত
তিনি বলেন, এখন আর প্রশ্ন নেই যে লেবার পার্টি পরিবর্তিত হয়েছে কি না—বরং প্রশ্ন উঠেছে তাঁর নেতৃত্ব ভবিষ্যতের জন্য উপযুক্ত কি না।
তিনি জানান, পার্লামেন্টারি পার্টির সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে তিনি পদত্যাগ করছেন।
তিনি বলেন, “আমি আমার দেশের স্বার্থকে সবার আগে রেখেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
রাজা চার্লসকে অবহিত ও নেতৃত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া
স্টারমার জানান, তিনি রাজা তৃতীয় চার্লসকে তাঁর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবহিত করেছেন।
তিনি লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটিকে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ করতে বলেছেন।
তার পরিকল্পনা অনুযায়ী—
মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে ৯ জুলাই
গ্রীষ্মকালীন ছুটির আগেই প্রক্রিয়া শেষ হবে
সেপ্টেম্বরের আগে নতুন নেতা নির্বাচিত হতে পারেন
তিনি বলেন, নতুন নেতৃত্ব আসা পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে থাকবেন এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করবেন।
উত্তরসূরির প্রতি সমর্থনের ঘোষণা
স্টারমার বলেন, তিনি তাঁর উত্তরসূরিকে পূর্ণ সমর্থন দেবেন।
তিনি বিশ্বাস প্রকাশ করেন যে, তাঁর পরে দায়িত্ব নেওয়া নেতৃত্ব যুক্তরাজ্যকে আরও শক্তিশালী ও ন্যায্য রাষ্ট্রে পরিণত করবে।
ব্যক্তিগত অনুভূতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ভাষণের শেষ অংশে স্টারমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলেন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর তিনি পরিবারকে সময় দেবেন।
তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রী ভিক এবং সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব আরও বেশি গুরুত্ব পাবে এবং তিনি একজন স্বামী ও পিতা হিসেবে বেশি সময় দিতে চান।
স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণা যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর ভাষণে যেমন রাজনৈতিক অর্জনের হিসাব ছিল, তেমনি ছিল দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা। এখন নজর থাকবে লেবার পার্টির নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের দিকে।