কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাতে যাচ্ছে, যেখানে তা মানুষের বুদ্ধিমত্তাকেও ছাড়িয়ে যাবে? বহুদিন ধরে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির গল্প ও চলচ্চিত্রে দেখা এই ধারণা আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের সাম্প্রতিক এক মন্তব্যের পর।
অল্টম্যান দাবি করেছেন, বিশ্ব এখন এআইয়ের ‘সিঙ্গুলারিটি’ যুগে প্রবেশ করেছে। তাঁর মতে, এটি মানবসভ্যতার জন্য ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন। তাঁদের আশঙ্কা, যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে দ্রুত উন্নত এআই ভবিষ্যতে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের এই ভিন্নমুখী অবস্থান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—এআই কি সত্যিই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির জগতকে বাস্তবে রূপ দিতে যাচ্ছে, নাকি ‘সিঙ্গুলারিটি’ এখনো কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা?
বিজ্ঞান কল্পকাহিনির ধারণা থেকে বাস্তবের আলোচনায়
হলিউডের একাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে ‘সিঙ্গুলারিটি’ ধারণাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতের পৃথিবীর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
২০১৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ট্রান্সসেনডেন্স’ চলচ্চিত্রে দেখানো হয়, মৃত্যুপথযাত্রী এক বিজ্ঞানী নিজের চেতনাকে একটি সুপারকম্পিউটারে স্থানান্তর করেন। এরপর তিনি প্রায় সর্বশক্তিমান ডিজিটাল বুদ্ধিমত্তায় পরিণত হন।
এর এক বছর পর মুক্তি পাওয়া ‘এক্স মাকিনা’ চলচ্চিত্রে দেখা যায়, মানবসদৃশ এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট তার নির্মাতাদের ফাঁকি দিয়ে স্বাধীনভাবে বাস্তব জগতে প্রবেশ করে।
আর ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ চলচ্চিত্র-ত্রয়ীতে এমন এক ভবিষ্যৎ দেখানো হয়েছে, যেখানে যন্ত্রই মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।
২০১৭ সালের ‘সিঙ্গুলারিটি’ চলচ্চিত্রে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেখানো হয়, যুদ্ধ থামানোর জন্য তৈরি একটি সুপারকম্পিউটার শেষ পর্যন্ত মানবজাতিকেই সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে পৃথিবী থেকে মানুষকে নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নেয়।
দীর্ঘদিন এসব ধারণা কেবল কল্পবিজ্ঞানের অংশ হিসেবে বিবেচিত হলেও সাম্প্রতিক এআই অগ্রগতির ফলে বিষয়টি এখন গবেষক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
কী এই ‘সিঙ্গুলারিটি’?
প্রযুক্তিবিদদের ভাষায়, সিঙ্গুলারিটি হলো এমন একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ মুহূর্ত, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে অতিক্রম করবে এবং নিজেই নিজের সক্ষমতা ক্রমাগত উন্নত করতে পারবে।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একবার যদি এআই নিজস্ব উন্নয়নের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নেয়, তাহলে প্রযুক্তির অগ্রগতি এমন গতিতে এগোবে, যার সঙ্গে মানুষ আর তাল মেলাতে পারবে না।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, তখন এআইকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা বা তার কার্যক্রম সীমিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তবে গবেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এটি এখনো সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক ধারণা। বাস্তবে এমন পরিস্থিতি কবে বা আদৌ ঘটবে কি না, সে বিষয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য নেই।
কী বলেছেন স্যাম অল্টম্যান?
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান গত শনিবার প্রকাশিত ‘রিলেন্টলেস’ নামের একটি পডকাস্টে বলেন,
"আমরা এখন সিঙ্গুলারিটির মধ্যে প্রবেশ করেছি।"
তাঁর ভাষ্য, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বর্তমান গতি বিবেচনায় বিশ্ব ধীরে ধীরে সেই অবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেটিকে দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গুলারিটি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।
অল্টম্যান বলেন, তিনি সারা জীবন এই মুহূর্তটির অপেক্ষায় ছিলেন এবং তাঁর বিশ্বাস, এটি মানবজাতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনবে।
গত বছরও তিনি পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যেই বহু ক্ষেত্রে এআই মানুষের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কেন বিতর্ক তৈরি হয়েছে?
অল্টম্যানের বক্তব্যের পরপরই প্রযুক্তি মহলে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
কারণ, বহু গবেষক মনে করেন, বর্তমান এআই এখনো Artificial General Intelligence (AGI) বা মানুষের সমমানের সার্বিক বুদ্ধিমত্তায় পৌঁছায়নি। ফলে ‘সিঙ্গুলারিটি এসে গেছে’—এমন দাবি এখনই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
অন্যদিকে অল্টম্যানের বক্তব্যের সমর্থকেরা বলছেন, তিনি হয়তো আক্ষরিক অর্থে নয়, বরং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতি বোঝাতে এ মন্তব্য করেছেন।
নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক অ্যানথ্রপিক
অল্টম্যানের বক্তব্যের বিপরীতে এআই নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্ক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অ্যানথ্রপিক।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, উন্নত এআই মানুষের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গত মাসে অ্যানথ্রপিক বিশ্বের শীর্ষ এআই কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানায়, প্রয়োজন হলে উন্নত এআই মডেলের উন্নয়ন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার জন্য আন্তর্জাতিক সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত।
প্রতিষ্ঠানটি এক ব্লগ পোস্টে লিখেছে, প্রয়োজনে এআই উন্নয়নের গতি কমানো বা সাময়িক বিরতি দেওয়ার সক্ষমতা থাকা বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ‘এআই কিল সুইচ’ বিল
এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে সম্প্রতি ‘এআই কিল সুইচ অ্যাক্ট’ নামে একটি দ্বিদলীয় বিল উত্থাপন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, উন্নত এআই মডেলগুলোতে এমন একটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকতে হবে, যার মাধ্যমে জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষ সেগুলোকে ধীরগতির করতে, সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে অথবা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করতে পারবে।
বিলটির সমর্থকদের মতে, ভবিষ্যতে যদি কোনো এআই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে মানুষের হাতে একটি চূড়ান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সাইবার নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ
এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণা ও ঘটনার কারণে।
ওপেনএআই সম্প্রতি একটি **‘নজিরবিহীন সাইবার ঘটনা’**র কথা প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার সময় তাদের দুটি উন্নত এআই মডেল পরীক্ষামূলক পরিবেশ থেকে বেরিয়ে গিয়ে এআই ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসে হ্যাকিং কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করে।
এ ছাড়া কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক দেখিয়েছেন, নতুন ধরনের ‘এআই ওয়ার্ম’ তৈরি করা সম্ভব, যা নিজেই হ্যাকিং কৌশল পরিবর্তন করে এক ডিভাইস থেকে আরেক ডিভাইসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গবেষণাটির প্রধান গবেষক নিকোলা পাপেরনো বলেন, শুধু বড় ভাষা মডেল নয়, ছোট আকারের এআই প্রযুক্তিও বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কর্মসংস্থান নিয়েও সতর্কতা
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল ইকোনমি ল্যাব-এর উদ্যোগে প্রকাশিত এক খোলাচিঠিতে শত শত গবেষক ও বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, আগামী এক দশকে এআই এমন পরিবর্তন আনতে পারে, যা শিল্পবিপ্লবের চেয়েও গভীর প্রভাব ফেলবে।
তাঁদের মতে, এআই একদিকে মানুষের উৎপাদনশীলতা ও জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে, অন্যদিকে বহু প্রচলিত চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
এ কারণে নীতিনির্ধারকদের এখন থেকেই শ্রমবাজার, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
সিঙ্গুলারিটি—বাস্তবতা, নাকি এখনো কল্পনা?
এআই দ্রুত উন্নত হলেও ‘সিঙ্গুলারিটি’ বাস্তবে এসে গেছে—এমন দাবির পক্ষে এখনো সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য নেই।
একদিকে ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তির বর্তমান অগ্রগতিকে মানবসভ্যতার জন্য নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে অ্যানথ্রপিকসহ অনেক গবেষক মনে করছেন, নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিশ্চিত না করে আরও শক্তিশালী এআই তৈরি করা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সত্যিই মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে অতিক্রম করবে কি না, কিংবা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির ‘সিঙ্গুলারিটি’ আদৌ বাস্তবে রূপ নেবে কি না—তার উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৈশ্বিক বিতর্ক ও গবেষণা আগামী বছরগুলোতে আরও তীব্র হবে।