ঢাকা

পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর বিতর্কে ভোট রাজনীতির নতুন ইঙ্গিত, বিশ্লেষণে তথ্য-উপাত্ত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্কিত ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বা Special Intensive Revision (SIR)–এর প্রভাব নিয়ে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া এবং নির্বাচনী ফলাফলে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে কি না—তা নিয়েই এখন চলছে পরিসংখ্যানভিত্তিক আলোচনা।

বিশ্লেষণভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, এই ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯১ লাখ নাম বাদ পড়েছে এবং নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ভোটার। বিষয়টি কেন্দ্র করে অভিযোগ উঠেছে, এই প্রক্রিয়া পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তনের দিকে প্রভাব ফেলেছে কি না।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম The Wire–এর তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে অন্তত ১৫০টি আসনে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়-পরাজয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল। এই পরিসংখ্যানই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

ভোটার তালিকা পরিবর্তন ও নির্বাচনী সমীকরণ

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কলকাতা সংলগ্ন উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাতেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটে। ২০২১ সালের নির্বাচনে যেখানে All India Trinamool Congress বিপুল আধিপত্য বজায় রেখেছিল, সেখানে সাম্প্রতিক ফলাফলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে।

উত্তর ২৪ পরগনার ২৬টি বিতর্কিত আসনের মধ্যে ২০২১ সালে তৃণমূল ২৩টি আসনে জয় পেলেও পরবর্তী নির্বাচনী চিত্রে Bharatiya Janata Party ২১টি আসন দখল করে নেয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনায়ও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে, যেখানে পূর্বে তৃণমূলের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের সঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা এবং জয়ের ব্যবধানের সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িত।

অন্যান্য জেলায় প্রভাব

মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া ও হুগলি জেলাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদে যেখানে আগে তৃণমূলের শক্ত অবস্থান ছিল, সেখানে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বেশি বিভক্ত হয়ে পড়ে—বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়ই কিছু আসনে জয় পায়।

পূর্ব বর্ধমান জেলায় ১৩টি প্রভাবিত আসনের মধ্যে অধিকাংশই তৃণমূলের হাতছাড়া হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। হাওড়া ও হুগলিতেও একই ধরনের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস দেখা গেছে।

১৫০ আসনে ‘ডাটা ইমপ্যাক্ট’ বিতর্ক

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৫০টি আসনে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়-পরাজয়ের ব্যবধানকে ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব কতটা ছিল—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বিশেষ করে এএসডিডি (অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, বাতিল ও বাস্তুচ্যুত) এবং ইউএ (আইনি পর্যালোচনায় অযোগ্য ঘোষিত) শ্রেণির ভোটারদের বাদ দেওয়ার ফলে বহু আসনের গাণিতিক সমীকরণ বদলে যায়।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এক পর্যবেক্ষণে বলেন, যদি ভোটারদের একটি বড় অংশ ভোট দিতে না পারেন এবং জয়-পরাজয়ের ব্যবধান ছোট হয়, তাহলে নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদিও আদালত সরাসরি কোনো চূড়ান্ত মত দেয়নি, তবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

বিশ্লেষণমূলক ‘স্ট্রেস টেস্ট’

বিশ্লেষণে দুটি সম্ভাব্য মডেল ব্যবহার করা হয়েছে—

প্রথম মডেলে ধরা হয়েছে, বাদ পড়া ভোটাররা সবাই দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দলকে ভোট দিতেন এবং নতুন ভোটাররা বিজয়ী দলের পক্ষে থাকতেন। এই মডেল অনুযায়ী, ১৩৭টি পরিবর্তিত আসনের মধ্যে ৮৭টিতে ফল উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়।

দ্বিতীয় মডেলে ২০২১ সালের ভোটের প্রবণতা অনুযায়ী ভোটার আচরণ পুনর্গঠন করা হয়। সেখানে দেখা যায়, মাত্র ১১টি আসনের ফল বদলাতে পারে, তবে সবগুলোই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষে যায়।

রাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন

ডেটা বিশ্লেষণ বলছে, কম ব্যবধানের আসনগুলোয় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়েছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ইউএ শ্রেণির ভোটার বাদ পড়ার হার রাজনৈতিক ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের ‘কাউন্টার ফ্যাকচুয়াল’ মডেল বাস্তব ভোটার আচরণ নিশ্চিত করে না; এটি কেবল একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ।

শেষ মূল্যায়ন

তথ্য-উপাত্ত বলছে, এসআইআর প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফলকে পুরোপুরি উল্টে দেয়নি, তবে বহু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে এর প্রভাব নির্বাচনী সমীকরণ বদলে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

যে রাজ্যে বহু আসনের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় অল্প ভোটের ব্যবধানে, সেখানে ভোটার তালিকা সংশোধন নিজেই

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স