পবিত্র হজ মৌসুমে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর সতর্কবার্তার পর ইরানে পরিকল্পিত সামরিক হামলা পিছিয়ে দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—এমন তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম Middle East Eye।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা সতর্ক করেন যে, হজ চলাকালীন ইরানে হামলা চালানো হলে মুসলিম বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়তে পারে।
হজ মৌসুমে সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কা
মিডল ইস্ট আইয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত দুইজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ট্রাম্পকে সতর্ক করে জানান—হজের সময় ইরানে হামলা চালানো হলে সৌদি আরবসহ পুরো অঞ্চলে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তাঁদের মতে, ওই সময়ে লাখো হজযাত্রী সৌদি আরবে অবস্থান করবেন, এবং বিমান চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। এতে হজ ব্যবস্থাপনায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি ছিল।
এ বছর হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার কথা ২৪ মে থেকে, যা ছয় দিন ধরে চলবে। ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো মুসল্লি সৌদি আরবে পৌঁছে গেছেন।
প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক চাপ
প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু আঞ্চলিক মিত্র দেশ নয়, ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারাও সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, এই সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রশাসনের ভেতরে আলোচনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়—হজ মৌসুমে এমন হামলা মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল করবে।
অতীত সংঘাত ও উত্তেজনার ধারাবাহিকতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা চালিয়েছিল। ওই ঘটনার পর ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়।
ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের জ্বালানি অবকাঠামো বা বেসামরিক স্থাপনায় নতুন কোনো হামলা হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বৈশ্বিক পর্যায়ে সংঘাত ছড়িয়ে দিতে পারে।
কৌশলগত বার্তা ও বিভ্রান্তির অভিযোগ
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অতীতেও ইরানকে বিভ্রান্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র নানা ধরনের কূটনৈতিক বার্তা ব্যবহার করেছে। ফেব্রুয়ারির আগে জেনেভায় তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে—এমন ধারণা দেওয়ার পরই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প দাবি করেন, উপসাগরীয় নেতাদের হস্তক্ষেপের কারণে তিনি গত মঙ্গলবার রাতে ইরানে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
তিনি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, আঞ্চলিক নেতারা বিশ্বাস করেন যে, একটি সমঝোতার সুযোগ এখনও রয়েছে।
সংঘাত আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হজ মৌসুম শেষ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তাঁদের মতে, পরিস্থিতি আপাতত স্থগিত থাকলেও আগামী কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত আবারও সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আঞ্চলিক প্রভাব ও জ্বালানি নিরাপত্তা
সংঘাতের সম্ভাবনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো—বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার এবং ওমান।
হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ ইতিমধ্যেই উত্তেজনার প্রভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিতে প্রভাব পড়ছে।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হজ মৌসুমের ধর্মীয় ও মানবিক গুরুত্ব বিবেচনায় এনে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ইরানে হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেছে। তবে কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এখনো অস্থির এবং সংঘাতের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।