কুয়ালালামপুরের আকাশে তখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসছে। বিশাল অডিটোরিয়ামজুড়ে উত্তেজনা আর অপেক্ষার মিশ্র আবহ। আন্তর্জাতিক পুরকৌশল প্রতিযোগিতার ফল ঘোষণা চলছে একের পর এক। বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় দলের নাম উচ্চারণ করছেন সঞ্চালক। চারপাশে শত শত প্রতিযোগী শিক্ষার্থী—কেউ উৎকণ্ঠায় হাত মুঠো করে বসে আছেন, কেউ আবার নীরবে তাকিয়ে আছেন মঞ্চের দিকে।
এই ভিড়ের মধ্যেই ছিল বাংলাদেশের একটি ছোট দল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন সঞ্চালক উচ্চারণ করলেন—‘গ্রিনকোর বাংলাদেশ’, তখন যেন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল সময়। আনন্দ, স্বস্তি আর গর্বে আত্মহারা হয়ে ওঠেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)-এর চার শিক্ষার্থী।
গত শনিবার মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পুরকৌশল প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে দলটি। হংকং, তাইওয়ান, তুরস্ক, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার ২৭টি শক্তিশালী দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এই সাফল্য অর্জন করে তারা। সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এই অর্জন এখন চুয়েটের শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক নতুন গল্প।
তবে এই সাফল্যের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়টি প্রতিযোগিতার মঞ্চে নয়, বরং তারও অনেক আগে শুরু হয়েছিল। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ার পরই সামনে আসে বড় চ্যালেঞ্জ—অর্থসংকট। বিদেশ যাত্রা, থাকা-খাওয়া ও রেজিস্ট্রেশন ফিসহ পুরো আয়োজনের ব্যয় বহন করা ছিল কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা না পাওয়ায় শুরুতে তাঁদের অংশগ্রহণই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
কিন্তু থেমে যাননি শিক্ষার্থীরা। নিজেদের সঞ্চয়, পরিবারের সহায়তা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের ছোট ছোট অবদানে ধীরে ধীরে তৈরি হয় বিদেশযাত্রার পথ। একই সঙ্গে চলতে থাকে কঠোর প্রস্তুতি।
ক্লাস, ল্যাব ও পরীক্ষার চাপ সামলেও তাঁরা দিন-রাত কাজ করেছেন পরিবেশবান্ধব কংক্রিট নিয়ে। কখনো গভীর রাত পর্যন্ত মিশ্রণের অনুপাত পরিবর্তন করে পরীক্ষা চালানো, কখনো ব্যর্থ ট্রায়ালের পর আবার শুরু থেকে নতুনভাবে কাজ—সব মিলিয়ে প্রতিটি ধাপ ছিল কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।
শুধু প্রযুক্তিগত কাজই নয়, উপস্থাপনার প্রস্তুতিও ছিল সমান চ্যালেঞ্জের। বিচারকদের সামনে নিজেদের ধারণা নিখুঁতভাবে তুলে ধরতে বারবার অনুশীলন করেছেন তাঁরা। একই স্লাইড, একই বক্তব্য ও একই যুক্তি নিয়ে চলেছে নিরবচ্ছিন্ন প্রস্তুতি, যতক্ষণ না প্রতিটি শব্দ আত্মবিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।
প্রতিযোগিতার মূল বিষয় ছিল পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার করে টেকসই নির্মাণ সমাধান তৈরি করা। অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে শুধু উদ্ভাবনী নির্মাণসামগ্রী তৈরি করলেই হয়নি; সেই উপকরণের চাপসহনশীলতা পরীক্ষা, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং বিচারকদের সামনে বাস্তবভিত্তিক উপস্থাপনাও করতে হয়েছে।
কঠিন সেই প্রতিযোগিতায় আত্মবিশ্বাস আর পরিশ্রমকে পুঁজি করেই সাফল্যের মুখ দেখেছে চুয়েটের দল।
দলের সদস্য নাজমুস সাকিব নাবিল বলেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা তাঁদের জন্য গর্বের বিষয়। তবে সবচেয়ে কঠিন ছিল সেখানে পৌঁছানো। তিনি বলেন, “নিজেদের চেষ্টায়, অনেক কষ্ট করে আমরা এখানে এসেছি। তারপরও দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছাটাই আমাদের এগিয়ে নিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের বিশেষ তহবিল সহায়তা দেয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের সহায়তার সুযোগ বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীরা আরও বড় অর্জন এনে দিতে পারবে।
এই অর্জনে গর্বিত শিক্ষকরাও। জি এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের এই সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তাঁদের কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠা প্রশংসার দাবিদার। তিনি মনে করেন, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা পেলে দেশের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বড় সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবে।
চুয়েট শিক্ষার্থীদের এই অর্জন শুধু একটি প্রতিযোগিতার ফল নয়; বরং সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্বপ্ন দেখার সাহস, পরিশ্রম এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।