এবারের জাতীয় বাজেট কোনোভাবেই লুটপাটের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া ‘লুটেরাদের বাজেট’ হতে পারে না—এমন মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও রংপুর–৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তাঁর মতে, বাজেটকে অবশ্যই সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রণয়ন করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (তারিখ উল্লেখিত নয়) বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন। ‘বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই আয়োজন করে এনসিপির ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটি।
বাজেট নিয়ে এনসিপির অবস্থান
আখতার হোসেন বলেন, প্রতিবছর বাজেট ঘোষণার সময় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে বাজেট পাসের পর তার প্রতিফলন দেখা যায় না। তাঁর ভাষায়, এসব প্রতিশ্রুতি অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিগত সময়ের অর্থনৈতিক কাঠামোতে করপোরেট গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব ছিল অত্যন্ত বেশি, যার ফলে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ সেই ক্ষতির বোঝা বহন করছে।
একই বক্তব্যে তিনি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ–এর চেয়ারম্যানকে ইঙ্গিত করে বলেন, অতীতে যেসব গোষ্ঠী দেশের সম্পদ ব্যবহার করেছে, তারা এখন দায় এড়াতে নানা অবস্থান নিচ্ছে। তাঁর দাবি, ভবিষ্যতের বাজেট যেন কোনোভাবেই দুর্নীতিবাজ বা লুটপাটকারীদের সুবিধা না দেয়।
এনসিপির ছায়া বাজেট উদ্যোগ
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে এনসিপির সংসদ সদস্য ও ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটির প্রধান আতিক মুজাহিদ বলেন, সাধারণ মানুষের চাহিদা বোঝার জন্য তারা নিম্ন আয়ের মানুষ, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, জনগণ সরকারের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নয়, বরং ন্যায্যতা, নিশ্চিত সুযোগ এবং হয়রানিমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রত্যাশা করে। এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করেই এনসিপি তাদের বিকল্প বাজেট প্রস্তাব তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ
আলোচনার প্রথম পর্বে সাবেক অর্থসচিব ও সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, দেশের কর–জিডিপি অনুপাত এখনো অত্যন্ত কম। সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়ালে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে বাধাগ্রস্ত করবে।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে থাকায় প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ছে। এগুলো একক কাঠামোর আওতায় এনে ডিজিটালাইজ করলে কার্যকারিতা বাড়বে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)–এর অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী প্রতি তিন মাসে বাজেট অগ্রগতি প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। এতে স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব ঘাটতির কারণে উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হয়েছে, যা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ব্যাংক খাত ও খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ
আলোচনায় কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার অধ্যাপক খান জহিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, খেলাপি ঋণের পরিমাণই বিপুল, যা সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি আরও দাবি করেন, ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও অর্থপাচারের কারণে উন্নয়ন ব্যয় পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অনুষ্ঠান ও আলোচনার কাঠামো
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং সঞ্চালনা করেন দলের যুগ্ম সদস্যসচিব সাদিয়া ফারজানা।
আলোচনা সভাটি পাঁচটি পর্বে অনুষ্ঠিত হয়—অর্থনৈতিক সংস্কার, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি ও শিল্প উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়ন ও জ্বালানি নীতি। সমাপনী বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম বক্তব্য রাখেন।
আলোচনায় বক্তারা সামগ্রিকভাবে একটি বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ ও জনগণকেন্দ্রিক বাজেট প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।