মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump–এর আক্রমণাত্মক ভাষা, ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত এবং দুর্বল হয়ে পড়া কূটনৈতিক কাঠামো নিয়ে ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো। ইউরোপ থেকে এশিয়া—অনেক দেশ এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় প্রচলিত কূটনৈতিক পথের বাইরে বিকল্প যোগাযোগ কৌশল খুঁজছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থেকে সরে গিয়ে প্রেসিডেন্টকেন্দ্রিক ও ঘনিষ্ঠ বৃত্তনির্ভর ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন কূটনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বের বহু দেশে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূত নেই, অনেক দূতাবাস ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণে পেশাদার কূটনীতিকদের বদলে প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রভাব বাড়ছে।
ইরান ইস্যুতে আতঙ্ক, বিভ্রান্ত ইউরোপ
গত এপ্রিলে ইরানকে উদ্দেশ করে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আজ রাতেই একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।’ তাঁর এমন মন্তব্য ইউরোপীয় কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ওয়াশিংটনে কর্মরত এক ইউরোপীয় কূটনীতিক রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বক্তব্যের পর তাঁদের সরকার জানতে চেয়েছিল—যুক্তরাষ্ট্র কি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
উদ্বেগ শুধু ইরানকে ঘিরেই ছিল না। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়াও একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করতে পারে—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল ইউরোপে। ফলে দুই অঞ্চলে একযোগে পারমাণবিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে চিন্তা বাড়ে।
পরিস্থিতি পরিষ্কার করতে ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কর্মকর্তারা ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ বা সম্ভাব্য নীতিগত অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দূতাবাসে শূন্যতা, নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা
রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বর্তমানে বিশ্বের অন্তত অর্ধেক মার্কিন দূতাবাসে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূত নেই। বিশেষ করে ইরান-সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতেও রাষ্ট্রদূতের অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
Margaret MacMillan, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ইতিহাসবিদ, বলেন, এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বোঝার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাঁর মতে, কূটনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে সংঘাত প্রতিরোধ ও সমঝোতা তৈরির ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন এ ধরনের সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র Tommy Pigott দাবি করেছেন, প্রশাসনের পুনর্গঠন কূটনীতিকে আরও কার্যকর ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক করেছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরে ব্যাপক রদবদল
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী Marco Rubio ২০২৫ সালে পররাষ্ট্র দপ্তরকে ‘অতিরিক্ত বড়’ এবং ‘আদর্শগতভাবে পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে উল্লেখ করেন। এরপর কয়েক হাজার কর্মকর্তা চাকরি হারান বা স্বেচ্ছায় অবসর নেন। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৩০ জন রাষ্ট্রদূতকে হঠাৎ ফিরিয়ে আনা হয়।
অনেক অভিজ্ঞ কূটনীতিক এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের আলোচিত ‘স্যাটারডে নাইট ম্যাসাকার’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁদের মতে, এতে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা পেশাদার কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা বড় ধাক্কা খেয়েছে।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত Bridget Brink বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন হঠাৎ করে ইউক্রেনের জন্য সামরিক সহায়তা স্থগিত করায় শুধু ইউক্রেন নয়, সেখানে অবস্থানরত মার্কিন কূটনীতিকেরাও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েন।
তিনি জানান, কেন সহায়তা বন্ধ করা হলো, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউস, পেন্টাগন কিংবা পররাষ্ট্র দপ্তর—কোথাও থেকে পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। অনেক কর্মকর্তা প্রেসিডেন্টের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে নীতির ইঙ্গিত বোঝার চেষ্টা করছিলেন।
ট্রাম্প ঘনিষ্ঠদের বাড়তি প্রভাব
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চ্যানেলের বাইরে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত আস্থাভাজনদের গুরুত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে তাঁর জামাতা Jared Kushner এবং ব্যবসায়ী Steve Witkoff আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানকে নিয়ে জেনেভায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে তাঁদের সম্পৃক্ততা ছিল বলে জানা গেছে। তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, আলোচনায় অংশ নেওয়া মার্কিন প্রতিনিধিদলের অনেকেরই পারমাণবিক প্রযুক্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ছিল না।
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশ্লেষক Kelsey Davenport বলেন, আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধিদলের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছে।
মিত্রদেশগুলোর নতুন কৌশল
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোও নতুন কূটনৈতিক পন্থা নিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য প্রতিনিধিদের পাশ কাটিয়ে সরাসরি হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। জাপানও ট্রাম্পের কাছে বার্তা পৌঁছাতে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা Masayoshi Son–কে ব্যবহার করেছে।
জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী Shigeru Ishiba রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্পের আশপাশের ব্যক্তিরা সাধারণত তাঁর অবস্থানের বাইরে যান না। ফলে সবাই সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করত, কারণ সেটিকেই সবচেয়ে কার্যকর পথ মনে করা হতো।
‘মেরকেল পদ্ধতি’ ও নীরব কূটনীতি
ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত আচরণের কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রকাশ্যে বিরোধিতা কমিয়ে ‘নীরব কূটনীতি’র পথে হাঁটছে। ইরান নিয়ে ট্রাম্পের হুমকির পর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি একটি কঠোর যৌথ বিবৃতি প্রস্তুত করলেও পরে সেটি প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এক ইউরোপীয় কূটনীতিকের ভাষায়, তাঁদের ধারণা ছিল—ট্রাম্প প্রায়ই উচ্চস্বরে হুমকি দেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব পদক্ষেপ নেন না। তাই প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া দেখালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারত।
এই কৌশলকে ইউরোপীয় কূটনীতিকেরা ‘মেরকেল পদ্ধতি’ বলে উল্লেখ করছেন। সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর Angela Merkel ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে প্রকাশ্য সংঘাত এড়িয়ে নীরব ও ধৈর্যশীল কূটনৈতিক তৎপরতার পথ নিয়েছিলেন। এখন ইউরোপের অনেক দেশ সেই একই পন্থা অনুসরণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যুগে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতি শুধু ভাষা ও আচরণে নয়, কাঠামোগতভাবেও বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এতে ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক প্রভাব ও বিশ্বাসযোগ্যতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।