ঢাকা

রাজনীতি নিয়ে জেন–জিদের নতুন পরীক্ষা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতের তরুণ সমাজের হতাশা, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক অসন্তোষ এবার নতুন এক ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি নামে পরিচিত এই ভার্চ্যুয়াল রাজনৈতিক উদ্যোগটি অল্প সময়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। তেলাপোকাকে প্রতীক বানিয়ে তৈরি হওয়া এই আন্দোলন মূলত ভারতের জেন–জি তরুণদের ক্ষোভ, হতাশা ও বিদ্রূপের ভাষা হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে একটি মন্তব্য ঘিরে শুরু হওয়া ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ দ্রুতই রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতীক হয়ে উঠেছে।

প্রধান বিচারপতির মন্তব্য থেকেই শুরু

ঘটনার সূত্রপাত ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি Surya Kant–এর এক মন্তব্যকে ঘিরে। গত সপ্তাহে এক শুনানিতে তিনি কিছু বেকার তরুণ ও অ্যাকটিভিস্টকে “তেলাপোকার মতো” বলে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, কিছু তরুণ চাকরি বা পেশায় জায়গা করে নিতে না পেরে পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা, সাংবাদিকতা কিংবা জনস্বার্থমূলক প্রচারণায় যুক্ত হয়ে সবাইকে আক্রমণ শুরু করে। তাঁর এই মন্তব্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক তরুণ এটিকে অপমানজনক ও অবজ্ঞাসূচক হিসেবে দেখেন।

পরবর্তীতে বিচারপতি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি মূলত ভুয়া ডিগ্রিধারীদের প্রসঙ্গ টেনেছিলেন, পুরো তরুণ সমাজকে অপমান করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু ততক্ষণে অনলাইনে শুরু হয়ে গেছে এক নতুন ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন—‘ককরোচ জনতা পার্টি’।

তেলাপোকা থেকে প্রতিরোধের প্রতীক

ভারতের তরুণেরা তেলাপোকাকেই প্রতীক হিসেবে বেছে নেয়। সাধারণত প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিকে থাকার ক্ষমতার কারণে পরিচিত এই পোকাটিকে তারা নিজেদের সংগ্রাম ও বেঁচে থাকার রূপক হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

মিম, ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও, ভুয়া নির্বাচনী স্লোগান ও রাজনৈতিক কৌতুকের মাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সিজেপি। দুর্নীতি, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও রাজনৈতিক অকার্যকারিতাকে কেন্দ্র করে তৈরি কনটেন্ট লাখো তরুণের মধ্যে সাড়া ফেলে।

গত শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট চালু করার পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ইনস্টাগ্রামে সিজেপির অনুসারী সংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। তুলনামূলকভাবে ভারতের ক্ষমতাসীন দল Bharatiya Janata Party–এর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী প্রায় ৮৮ লাখ।

‘তরুণেরা ক্ষোভ প্রকাশের জায়গা খুঁজছে’

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা Abhijit Dipke বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের Boston University–এর শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ হিসেবেও কাজ করেন।

দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই আন্দোলনের উত্থান মোটেও পরিকল্পিত ছিল না। বরং এটি ভারতীয় তরুণদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশার বহিঃপ্রকাশ।

তাঁর ভাষায়, “তরুণেরা ভীষণ হতাশ। তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশের কোনো জায়গা নেই। তাঁরা সরকারের ওপর খুবই রাগান্বিত।”

অভিজিৎ মনে করেন, পাঁচ বছর আগেও প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi বা তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে অনেকে ভয় পেতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।

বেকারত্ব, বৈষম্য ও রাজনৈতিক হতাশা

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের তরুণ সমাজ বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। দেশটির মোট জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ হলেও তাঁদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চাকরিসংকট, দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে রয়েছে।

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনাও তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় বিভাজন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে তরুণ ভোটারদের একাংশের মধ্যে।

এই বাস্তবতায় সিজেপির ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট অনেক তরুণের কাছে নিজেদের হতাশা প্রকাশের নতুন ভাষা হয়ে উঠেছে।

ব্যঙ্গের মধ্যেও রাজনৈতিক বার্তা

সিজেপি নিজেদের নিয়েও হাস্যরস করতে পিছপা হয়নি। দলটির সদস্য হওয়ার ‘মজার শর্ত’ হিসেবে বলা হয়েছে—বেকার হতে হবে, অলস হতে হবে, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকতে হবে এবং “পেশাদারের মতো রাগ ঝাড়তে” জানতে হবে।

তাদের ব্যঙ্গাত্মক ইশতেহারে ভারতের রাজনীতির নানা বিতর্কিত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

ভোট কারচুপির অভিযোগ
করপোরেট গণমাধ্যমের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক
অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের সরকারি পদে নিয়োগ
রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক পক্ষপাত

ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের আড়ালে এসব বিষয়ই তরুণদের রাজনৈতিক হতাশা ও অবিশ্বাসকে সামনে নিয়ে এসেছে।

বিরোধীপন্থী প্রচারণা নাকি বাস্তব ক্ষোভ?

সমালোচকদের একাংশ সিজেপিকে কেবল “ডিজিটাল নাটক” হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী মোদির সমর্থকেরা অভিযোগ করছেন, এটি বিরোধীপন্থী একটি অনলাইন রাজনৈতিক কৌশল।

কারণ, অভিজিৎ দিপকে আগে Aam Aadmi Party–এর সঙ্গে কাজ করেছিলেন। সেই সূত্র ধরেই সমালোচকেরা বলছেন, এই আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।

তাঁদের মতে, অনলাইনের জনপ্রিয়তা বাস্তব রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারবে না। কারণ, এটি এখনো কোনো তৃণমূলভিত্তিক সংগঠনে পরিণত হয়নি।

তবে অভিজিৎ এই সমালোচনা নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, সিজেপির সঙ্গে কোনো বাস্তব রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক নেই। বরং এটি দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক অসন্তোষেরই প্রতিফলন।

তিনি শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনের উদাহরণ টেনে বলেন, এসব আন্দোলনে তরুণদের ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অনলাইন থেকে রাজপথে

শুরুতে পুরোপুরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর হলেও সিজেপির প্রভাব এখন ধীরে ধীরে রাজপথেও দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন বিক্ষোভে তরুণদের তেলাপোকার পোশাক পরে অংশ নিতে দেখা গেছে।

এদিকে আন্দোলনটি ঘিরে পাল্টা প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে। গতকাল অভিজিৎ জানান, ভারতে সিজেপির এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অ্যাকাউন্টটির অনুসারী ছিল প্রায় দুই লাখ।

কেন এটি বন্ধ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার ঘোষণা দেওয়া হয়।

নতুন পোস্টে লেখা ছিল, “তেলাপোকা ফিরে এসেছে।”

আরেকটি পোস্টে ব্যঙ্গ করে বলা হয়, “ভাবলেন আমাদের সরিয়ে দিতে পারবেন? হা হা।”

ডিজিটাল ব্যঙ্গ থেকে রাজনৈতিক বার্তা

পর্যবেক্ষকদের মতে, ককরোচ জনতা পার্টি হয়তো এখনো একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক শক্তি নয়। কিন্তু এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ভারতের তরুণদের একটি বড় অংশ প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষা থেকে সরে গিয়ে ব্যঙ্গ, মিম ও অনলাইন সংস্কৃতিকেই প্রতিবাদের নতুন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে।

তেলাপোকাকে ঘিরে তৈরি এই ব্যঙ্গাত্মক প্রতীক হয়তো আপাতদৃষ্টিতে হাস্যরসাত্মক; কিন্তু এর ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, হতাশা ও রাজনৈতিক অবিশ্বাসই এখন ভারতের ডিজিটাল প্রজন্মের নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স