ঢাকা

ইউরোপীয় নিরাপত্তায় নতুন চাপ, বেলারুশে রাশিয়ার পারমাণবিক তৎপরতা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রাশিয়া ও বেলারুশের যৌথ সামরিক মহড়ায় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রদর্শনী এবং নতুন করে কৌশলগত মোতায়েন ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো–এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত এই মহড়াকে ঘিরে ইউরোপে নতুন নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আল–জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলা এই মহড়ায় ‘ট্যাকটিক্যাল’ ও ‘স্ট্র্যাটেজিক’ উভয় ধরনের পারমাণবিক সক্ষমতা প্রদর্শন করা হয়। এতে কয়েক শ যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, যুদ্ধজাহাজ এবং পারমাণবিক সাবমেরিন অংশ নেয় বলে জানা গেছে।

মহড়ার আওতা পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি বেলারুশের সেনারাও এতে অংশ নেয়, যা ইউরোপের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে নতুন বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

লুকাশেঙ্কোর উপস্থিতি ও রাজনৈতিক বার্তা

প্রথমবারের মতো পারমাণবিক অস্ত্র মহড়ায় সরাসরি অংশ নেন লুকাশেঙ্কো। তিনি দাবি করেন, “আমরা কাউকে হুমকি দিচ্ছি না। তবে আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা আছে।”

তিনি আরও বলেন, “ব্রেস্ট থেকে ভ্লাদিভস্তক পর্যন্ত আমাদের পিতৃভূমি রক্ষায় আমরা যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।” তার এই বক্তব্যকে রাশিয়ার সঙ্গে বেলারুশের ঘনিষ্ঠ সামরিক সমন্বয়ের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

পুতিনের নির্দেশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন

মহড়ার সময় পুতিন রাশিয়ার কৌশলগত ও ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক বাহিনীর প্রস্তুতি আরও বাড়ানোর নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশলে কাজে লাগানো হবে।

মহড়ায় “ইয়ার্স” নামের আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণও প্রদর্শিত হয়। এই ক্ষেপণাস্ত্র একাধিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম এবং কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে বলে দাবি রুশ প্রতিরক্ষা সূত্রের।

বেলারুশে রুশ অস্ত্র ও ঘাঁটি

রাশিয়া ইতোমধ্যে বেলারুশে বিশেষ সংস্করণের যুদ্ধবিমান, ইস্কান্দার–এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পন্ন অস্ত্র মোতায়েন করেছে বলে জানা গেছে। এসব অস্ত্র ইউক্রেন সীমান্তের কাছাকাছি বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে রাখা হয়েছে।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর বেলারুশে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের আইনি অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে মস্কো–মিনস্ক সামরিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়।

ইউক্রেন যুদ্ধ ও নতুন উদ্বেগ

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, বেলারুশকে ব্যবহার করে রাশিয়া উত্তর ইউক্রেনে নতুন আগ্রাসনের পরিকল্পনা করছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বেলারুশ থেকে বড় আকারের আক্রমণ পরিচালনার সক্ষমতা সীমিত।

কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক ভলোদিমির ফেসেনকো মনে করেন, শুধু বেলারুশের ওপর নির্ভর করে বড় হামলা চালানো রাশিয়ার জন্য কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করবে।

‘বড় কিছু ঘটতে পারে’—বিশ্লেষকদের সতর্কতা

জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিন বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কোনো স্পষ্ট বাহ্যিক কারণ না থাকলেও “বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে” এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর মতে, পারমাণবিক সক্ষমতার এই প্রদর্শন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

কৌশলগত ও ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র কী

বিশ্লেষকদের মতে, ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরে ব্যবহৃত হয়, যেখানে ধ্বংসের পরিধি ছোট হতে পারে। বিপরীতে স্ট্র্যাটেজিক বা থার্মোনিউক্লিয়ার অস্ত্র ব্যাপক ধ্বংসক্ষমতা সম্পন্ন, যা বড় পরিসরে যুদ্ধ পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।

ইউরোপে নতুন নিরাপত্তা শঙ্কা

মস্কো ও মিনস্কের দাবি, এই মহড়া প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতির অংশ। তবে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে এবং ইউরোপে কৌশলগত অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।

চলমান এই সামরিক প্রদর্শনীকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এটি কেবল শক্তি প্রদর্শন, নাকি আসন্ন কোনো বড় কৌশলগত পরিবর্তনের পূর্বাভাস।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স