ঢাকা

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তি উদ্যোগে তেহরানে কাতার ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক উপস্থিতি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান অচলাবস্থা নিরসন ও সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি এগিয়ে নিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কাতারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল শুক্রবার ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছে। একই সময়ে সফরে রয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানায়, কাতারের দলটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে তেহরানে গেছে, যার লক্ষ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমিত করা এবং দুই পক্ষের বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

কাতারের মধ্যস্থতামূলক ভূমিকা

কাতার দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ব্যাক-চ্যানেল’ বা পর্দার আড়ালের যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। গাজা যুদ্ধসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির ভূমিকা থাকলেও সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে কিছুটা দূরত্বে ছিল দোহা।

তবে এবার পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়ে আবার সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকায় ফিরেছে কাতার। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নন-ন্যাটো মিত্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কেন্দ্রও বটে।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, “কাতারের প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে এসেছে, যাতে একটি চুক্তির দিকে অগ্রগতি হয়—যা যুদ্ধের অবসান ঘটাবে এবং ইরানের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর সমাধান করবে।”

পাকিস্তানের সক্রিয় মধ্যস্থতা

একই সময়ে পাকিস্তানও এই কূটনৈতিক উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ২১ ঘণ্টার সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও তা কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়।

পরবর্তীতে আবারও আলোচনার উদ্যোগে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান সক্রিয় রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।

মার্কো রুবিও সম্প্রতি বলেন, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় পাকিস্তানই প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। তিনি জানান, “আমরা মূলত পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করছি, যদিও অন্য দেশগুলোরও এতে স্বার্থ রয়েছে।”

পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ‘ডন’ জানায়, সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফরে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন।

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা ও সাম্প্রতিক সংঘাত

চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে গত কয়েক মাসের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে। সূত্রগুলো জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান ইসরায়েলসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়।

এরপর কাতারও আংশিকভাবে ক্ষতির শিকার হয়। ৪০ দিনের সংঘাত শেষে ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

তবে ১১–১২ এপ্রিলের আলোচনায় কোনো স্থায়ী সমঝোতা হয়নি, ফলে দ্বিতীয় দফা আলোচনা আয়োজনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

আলোচনার মূল বাধা

ইরানের এক ঊর্ধ্বতন সূত্র জানায়, এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি, তবে আলোচনায় কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে।

আলোচনার প্রধান দুইটি বিতর্কিত বিষয় হলো—

ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

এই দুই বিষয় নিয়েই মূলত মতপার্থক্য এখনো অব্যাহত রয়েছে।

কাতার ও আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান

কাতার বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও সামরিক অংশীদার। দেশটিতে অবস্থিত আল উদেইদ ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত।

অন্যদিকে ইরানের হামলায় কাতারের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—বিশেষ করে রাস লাফান এলএনজি স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল বলে জানা যায়।

এ পরিস্থিতির মধ্যেই কাতারের পুনরায় সক্রিয় মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা গ্রহণকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সম্ভাবনা

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে আলোচনায় কিছু অগ্রগতির ইঙ্গিত থাকলেও চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেছেন, “কিছু ভালো লক্ষণ আছে, তবে আমি খুব বেশি আশাবাদী নই—আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি পরিষ্কার হবে।”


কাতার ও পাকিস্তানের সক্রিয় মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে গভীর মতপার্থক্য থাকায় স্থায়ী সমঝোতার পথ এখনো জটিল ও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স