ঢাকা

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা: ইরানে হামলায় যুদ্ধবিরতি ভাঙার শঙ্কা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরানের হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একাধিক বিমান হামলা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক আলোচনাকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। কাতারে শান্তি আলোচনা শুরুর প্রাক্কালে এই হামলা হওয়ায় ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুদ্ধবিরতি টেকসই থাকবে কি না—সে প্রশ্নকে আরও জটিল করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দাবি করেছে, ইরানি বাহিনীর সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধে “আত্মরক্ষামূলক” পদক্ষেপ হিসেবে এ হামলা চালানো হয়েছে। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট স্থান বা ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বন্দর আব্বাস এলাকায় বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে, যা হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

এই ঘটনার সময় এমন এক প্রেক্ষাপটে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত থামাতে কাতারে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। একই সময়ে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলও দোহায় পৌঁছায় আলোচনায় অংশ নিতে।

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই হামলা, নতুন উত্তেজনা

গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর এই প্রথম বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা দেখা দিল। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেছে কি না তা নিশ্চিত নয়, তবে নতুন হামলাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স দাবি করেন, হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং মাইন বসানোর প্রস্তুতিতে থাকা নৌযান। তাঁর ভাষায়, চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র “সর্বোচ্চ সংযম” দেখাচ্ছে এবং নিজেদের বাহিনী রক্ষায় ব্যবস্থা নিচ্ছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও একই বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর প্রস্তুতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। তাঁর মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ “অঘোষিত অবরোধের” মুখে রয়েছে এবং তা দ্রুত খুলে দিতে হবে।

বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত হয়, ফলে এখানে যেকোনো অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

ইরানের পাল্টা অভিযোগ ও সামরিক দাবি

ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বলে দাবি করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই আক্রমণের ফলে যেকোনো পরিণতির দায় ওয়াশিংটনের।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও জানায়, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) একটি মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং ইরানি আকাশসীমায় প্রবেশকারী একটি যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। যদিও এসব ঘটনার সুনির্দিষ্ট সময় বা স্থান আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

একই সঙ্গে ইরানের সামরিক সূত্র দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার আগে সমুদ্রে একটি নৌযান লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়েছিল, যেখানে আইআরজিসির কয়েকজন সদস্য নিহত হন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকেও কঠোর প্রতিক্রিয়া এসেছে। এক বার্তায় বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো আর নিরাপদ থাকবে না এবং যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেওয়া হবে।

কূটনৈতিক অগ্রগতি বনাম সামরিক বাস্তবতা

ঘটনার সময়টি কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। কাতারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ ও নতুন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছিল। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হলেও এখনই কোনো চূড়ান্ত চুক্তির সম্ভাবনা নেই।

ইরানি মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, “বড় একটি অংশে আমরা একমত হয়েছি, তবে এর মানে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত—এমন নয়।”

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আলোচনা “ভালোভাবেই এগোচ্ছে”, তবে চুক্তি না হলে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, কূটনীতি ও সামরিক চাপ একসঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন।

জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক উদ্বেগ

হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা নতুন করে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রণালিতে যেকোনো সামরিক সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দোহায় ইরানি প্রতিনিধিদল এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে আলোচনা চললেও সাম্প্রতিক হামলা সেই প্রক্রিয়াকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে।

বিশ্লেষক অ্যালান ফিশারের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামান্য সংঘর্ষ আগেও হয়েছে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তা ভিন্ন মাত্রা নিচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “এ ধরনের হামলা চলমান আলোচনাকে লাইনচ্যুত করতে পারে।”


ইরানে মার্কিন হামলা যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। একদিকে কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতির ইঙ্গিত, অন্যদিকে সামরিক উত্তেজনার পুনরুত্থান—এই দ্বৈত বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।

পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সামরিক সংযমের ওপর। তবে আপাতত স্পষ্ট—শান্তির পথে যাত্রা আবারও বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স