ঢাকা

সেউতা–মেলিলা সীমান্তে অভিবাসন সংকট, একদিনে মরক্কো থেকে ৫০ হাজার মানুষের প্রবেশ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
উত্তর আফ্রিকায় মরক্কো সীমান্তঘেঁষা স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ৫০ হাজারের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষের প্রবেশের ঘটনায় ইউরোপজুড়ে নতুন করে অভিবাসন সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সীমান্তে নজিরবিহীন এই চাপের মধ্যে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। স্পেনের অংশে ৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, আর মরক্কোর দিকেও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

স্পেন সরকার জানিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার ৩০০ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে অথবা তারা স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে গেছেন। তবে বাকি হাজারো মানুষকে ঘিরে মানবিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট এখনো অব্যাহত রয়েছে।

কী ঘটেছে?

গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার পর্যন্ত মরক্কো ও স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতার মধ্যকার সীমান্তে কার্যত নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। এই সুযোগে স্থল ও সমুদ্রপথে কয়েক হাজার নয়, ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ স্পেনের ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করেন।

এই সংখ্যা সেউতার মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সমান, যা শহরটিতে অল্প সময়ের মধ্যে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি করে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ সেউতা ও মেলিলা?

সেউতা এবং মেলিলা উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। ভৌগোলিকভাবে এগুলো আফ্রিকায় অবস্থিত হলেও রাজনৈতিকভাবে স্পেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ।

এই দুটি শহরই আফ্রিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একমাত্র স্থল সীমান্ত, ফলে ইউরোপে প্রবেশ করতে চাওয়া অভিবাসীদের জন্য এগুলো বহু বছর ধরেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।

সেউতা থেকে প্রায় ২৫০ মাইল পূর্বে অবস্থিত মেলিলাও একইভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অন্যতম লক্ষ্য।

দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক বিরোধ

১৫৮০ সাল থেকে স্পেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা সেউতায় খ্রিষ্টান ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। স্থানীয় স্প্যানিশ ও মরক্কোর নাগরিকদের পাশাপাশি প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে বহু শ্রমিক সেখানে কাজ করতে যান।

তবে এত দীর্ঘ সময় পার হলেও মরক্কো এখনো সেউতা ও মেলিলাকে স্পেনের সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। দেশটি অঞ্চল দুটিকে নিজেদের অধিকৃত ভূখণ্ড বলে দাবি করে।

এই বিরোধ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু।

কেন বারবার অভিবাসীদের লক্ষ্য হয় এই সীমান্ত?

উন্নত জীবন, কর্মসংস্থান কিংবা নিজ দেশে যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও সহিংসতা থেকে মুক্তির আশায় আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের হাজারো মানুষ ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।

সেউতা ও মেলিলা সেই যাত্রার সবচেয়ে কাছের এবং তুলনামূলকভাবে সহজ প্রবেশপথ হওয়ায় এখানকার সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে।

তবুও অনেকে মরক্কোর ফনিদেক কিংবা বেলিউনেশ এলাকা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সাঁতরে কিংবা সীমান্তের উঁচু বেড়া টপকে স্পেনে প্রবেশের চেষ্টা করেন।

এ ধরনের যাত্রা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

২০২২ সালে মেলিলায় প্রবেশের চেষ্টাকালে অন্তত ২৩ জন নিহত হন।
২০১৪ সালে সেউতায় সাঁতরে সীমান্ত পার হওয়ার সময় অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
স্পেনে অভিবাসনের চিত্র

সেউতা ও মেলিলা সবচেয়ে আলোচিত সীমান্ত হলেও বাস্তবে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ এবং বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ হয়ে স্পেনে প্রবেশকারী অভিবাসীর সংখ্যা আরও বেশি।

বর্তমানে প্রায় ৫ কোটি জনসংখ্যার স্পেনে প্রায় ১ কোটি মানুষের জন্ম অন্য দেশে। তাঁদের বড় অংশ কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা ও মরক্কো থেকে এসেছেন এবং কৃষি, পর্যটন, নির্মাণ ও সেবা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ৩৫ হাজার ১৫৩ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৯৩ জনে।

কীভাবে এত মানুষ একসঙ্গে সীমান্ত পার হলো?

অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কীভাবে সীমান্ত অতিক্রম করলেন, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

মরক্কো সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে তারা কতটা কঠোর ছিল, সেটিও পরিষ্কার নয়।

তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এর পেছনে শুধু মানব পাচারকারীদের ভূমিকা নয়, মরক্কো-স্পেন-আলজেরিয়ার জটিল কূটনৈতিক সমীকরণও কাজ করতে পারে।

আলজেরিয়া সফরকে ঘিরে নতুন জল্পনা

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সম্প্রতি আলজেরিয়া সফর করেছেন। চার বছরের মধ্যে এটি ছিল স্পেনের কোনো প্রধানমন্ত্রীর প্রথম আলজেরিয়া সফর।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর মরক্কো ভালোভাবে নেয়নি।

২০২২ সালে স্পেন পশ্চিম সাহারা প্রশ্নে দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে এসে মরক্কোর প্রস্তাবকে সমর্থন করেছিল। এতে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত হলেও আলজেরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

সাম্প্রতিক আলজেরিয়া সফরকে সেই সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর এর প্রতিক্রিয়ায় মরক্কো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন কয়েকজন গবেষক।

২০২১ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি?

এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম নয়।

২০২১ সালের মে মাসেও কয়েক হাজার মানুষ হঠাৎ করে সেউতায় প্রবেশ করেছিলেন।

তখন পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী সংগঠন পলিসারিও ফ্রন্টের নেতাকে করোনা চিকিৎসার জন্য স্পেনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সে সময়ও মরক্কোর বিরুদ্ধে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার অভিযোগ উঠেছিল।

সানচেজ কী বলছেন?

সেউতা সফর করে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, মানব পাচারকারীরা স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায়কে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে।

ওই রায়ে বলা হয়েছিল, সমুদ্রপথে আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না।

সানচেজের মতে, এই গুজবই বহু মানুষকে সীমান্ত অতিক্রমে উৎসাহিত করেছে।

গবেষকদের ভিন্ন ব্যাখ্যা

ইতালির আন্তর্জাতিক রাজনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএসপিআই-এর অভিবাসনবিষয়ক গবেষক মাত্তেও ভিলা মনে করেন, ঘটনাটির পেছনে রাজনৈতিক কারণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর ভাষায়, যেখানে সাধারণত মাসে কয়েক শ মানুষ সীমান্ত পার হন, সেখানে এক রাতে ৫০ হাজার মানুষের প্রবেশ স্বাভাবিক নয়।

ভিলার ধারণা, ইউরোপের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং নিজেদের কৌশলগত গুরুত্ব বোঝাতেই মরক্কো সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে থাকতে পারে।

স্পেনের প্রতিক্রিয়া

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছে স্পেন।

প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই ঘটনাকে "স্পেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন" বলে উল্লেখ করেছেন।

এদিকে সীমান্তের বিশৃঙ্খলার ভিডিও ও ছবি প্রকাশের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

স্পেনের ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের সাম্প্রতিক অভিবাসন নীতিকে দায়ী করছে।

অন্যদিকে ইতালির কট্টর ডানপন্থী সরকার সাময়িকভাবে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন অঞ্চলের অবাধ যাতায়াত সীমিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে স্পেন বলছে, সেউতা ও মেলিলা সাধারণভাবে শেনজেন ব্যবস্থার আওতায় পড়ে না, তাই এমন পদক্ষেপ ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতির পরিপন্থী।

এদিকে ফ্রান্সও স্পেন সীমান্তে নিরাপত্তা ও তল্লাশি জোরদার করেছে।

সর্বশেষ এই ঘটনা শুধু একটি অভিবাসন সংকট নয়; বরং ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক দায়বদ্ধতা এবং উত্তর আফ্রিকার জটিল ভূরাজনৈতিক সম্পর্ককে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স