জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আসন্ন বাজেট, দলীয় শৃঙ্খলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কঠোর আইন প্রয়োগের বার্তা দিয়েছেন, আর প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বাজেটকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য রাজনৈতিক উসকানি ও বিভ্রান্তির বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার বিকেল তিনটায় জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারদলীয় সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভা প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টা ধরে চলে। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সভায় বিএনপির সংসদ সদস্যরা ছাড়াও মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত
সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে খুব শিগগিরই দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
সভায় উপস্থিত একাধিক সূত্রের মতে, তিনি শুধু অপরাধী চক্র নয়, দলের ভেতরে অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিশৃঙ্খলা কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের প্রতিও সতর্কবার্তা দেন। তিনি সংসদ সদস্যদের জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তাঁকে অন্তত দুবার প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তাগিদের মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার আরও সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বর্তমানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে এবং বাজেট অধিবেশনের আগে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিতে চেয়েছে।
বাজেট ঘিরে ‘উসকানি’ মোকাবিলায় ধৈর্যের আহ্বান
আগামীকাল রোববার শুরু হচ্ছে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন। তার আগে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাজেট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সভাসূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, যুদ্ধবিগ্রহ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজস্বসংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেই সরকার একটি বড় ঘাটতি বাজেট নিয়ে নতুন অর্থবছরে প্রবেশ করছে।
তবে তিনি সংসদ সদস্যদের আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার এমন একটি বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে যা দেশের বাস্তবতা ও জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থমন্ত্রী টানা ৪৮ ঘণ্টা বাজেট প্রস্তুতের কাজে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি নিজেও দীর্ঘ সময় ধরে বাজেট প্রণয়নের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন।
সভায় তিনি সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, বাজেট ঘোষণার পর বিরোধী দল ও বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কিংবা উসকানিমূলক বক্তব্য আসতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা হতে পারে। তাই সবাইকে ধৈর্য ও সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার আহ্বান জানান তিনি।
সংসদীয় দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব
সংসদীয় দলের বৈঠকের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব সভা শুধু রাজনৈতিক আলোচনা নয়, সংসদ সদস্যদের জন্য একটি কার্যকর প্রশিক্ষণমাধ্যম হিসেবেও কাজ করছে।
তিনি বলেন, সংসদীয় প্রশ্নোত্তর, মন্ত্রীদের জবাবদিহি, নীতিনির্ধারণী আলোচনা এবং আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সদস্যরা এ ধরনের বৈঠক থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও ইঙ্গিত দেন, ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন এলে বর্তমান সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকেই অনেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন। এজন্য সবাইকে সংসদীয় কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
একই সঙ্গে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
নারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে এলাকার দায়িত্ব বণ্টন
সভায় বিএনপির সংরক্ষিত আসনের ৩৬ জন নারী সংসদ সদস্য অংশ নেন। তাঁদের কয়েকজন আলোচনায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে মতামতও তুলে ধরেন।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী এসব নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে বিভিন্ন সংসদীয় আসনের দায়িত্ব ভাগ করে দেন। কাউকে একটি, কাউকে দুটি এবং কাউকে চারটি পর্যন্ত আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে যেসব আসনে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে, সেসব এলাকায় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম তদারকির জন্য নারী সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
যদিও সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের নিজস্ব কোনো ভৌগোলিক নির্বাচনী এলাকা নেই, তবু রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত সাংগঠনিক প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁদের বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব দিয়ে থাকে।
এনসিটি ইজারা নিয়ে আপত্তি
বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে আলোচনা হয়।
একজন সংসদ সদস্য দুবাইভিত্তিক DP World–এর কাছে এনসিটির পরিচালন দায়িত্ব হস্তান্তরের সম্ভাব্য উদ্যোগের বিরোধিতা করেন।
তাঁর বক্তব্য ছিল, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এনসিটি পরিচালনায় সক্ষম। যদি বিদেশি বিনিয়োগ বা আন্তর্জাতিক অপারেটরের প্রয়োজন হয়, তবে নতুন কোনো টার্মিনালে সে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে; কিন্তু বিদ্যমান এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, এনসিটির সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর সরকারের রাজনৈতিক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। তাই এটি জাতীয় স্বার্থের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মন্ত্রীদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্ব
সভায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন এবং প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বক্তব্য দেন।
তাঁরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের অবহিত করেন। পরে সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা তার উত্তর দেন।
শিক্ষা খাতে উদ্বেগ: কমছে শিক্ষার্থী, বাড়ছে মাদ্রাসামুখিতা
সভায় শিক্ষা খাতের বিভিন্ন বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। সংসদ সদস্যরা বিশেষভাবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
একই সঙ্গে দেশে মাদ্রাসা শিক্ষার ক্রমবর্ধমান বিস্তারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। সদস্যরা শিক্ষাব্যবস্থার ভারসাম্য, মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থী ধরে রাখার কৌশল নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে ব্যাখ্যা চান।
ধর্মীয় শিক্ষকের সংকটও আলোচনায় স্থান পায়। বিশেষ করে হিন্দুধর্ম বিষয়ের শিক্ষকের ঘাটতি নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান কয়েকজন সংসদ সদস্য।
স্বাস্থ্যসেবায় জনবল সংকট দূর করার দাবি
স্বাস্থ্য খাত নিয়ে আলোচনায় সংসদ সদস্যরা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর জনবলসংকট ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তাঁরা বলেন, সব উপজেলায় ১০১ শয্যার হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা ইতিবাচক হলেও বিদ্যমান হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকট সমাধান না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।
সভায় স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেল নিয়ে আলোচনা হয় বলেও জানা গেছে। সূত্রমতে, সরকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ বা ব্যবস্থাপনা সহযোগিতার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এ উদ্যোগ পরীক্ষামূলকভাবে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, যা একসময় পিজি হাসপাতাল নামে পরিচিত ছিল, সেখানকার কিছু সেবা কার্যক্রম দিয়ে শুরু হতে পারে।
বাজেট অধিবেশনের আগে রাজনৈতিক বার্তা
বাজেট অধিবেশন শুরুর আগে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের এ বৈঠককে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বৈঠকে একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাজেট নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে সরকার।
একই সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলা, সংসদীয় দক্ষতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা সরকারের ভবিষ্যৎ নীতিগত অগ্রাধিকারেরও ইঙ্গিত দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।