আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে ১১–দলীয় ঐক্যের ভেতরে কৌশলগত মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একসঙ্গে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ভিন্ন অবস্থান দেখা দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও জোটের কয়েকটি শরিক দল সমন্বিত নির্বাচনী কৌশল ধরে রাখতে চায়।
জোট-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা না হলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিস বিকল্প নির্বাচনী বোঝাপড়ার পথে হাঁটতে পারে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ অন্যান্য দলের সঙ্গে সম্ভাব্য সমন্বয়ের বিষয়েও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আগামী অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোও সাংগঠনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থী নির্ধারণ ও নির্বাচনী কৌশল চূড়ান্ত করার কাজ শুরু করেছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ‘প্রথম বড় পরীক্ষা’ হিসেবে দেখছে দলগুলো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটিই হবে দলগুলোর প্রথম বড় নির্বাচনী লড়াই। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সাংগঠনিক শক্তি যাচাই এবং স্থানীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে প্রায় সব রাজনৈতিক দল।
জোটভুক্ত কয়েকটি দলের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও যদি সমন্বিত কৌশল গ্রহণ না করা হয়, তাহলে একই এলাকায় জোটের একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এতে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি সুবিধা পেতে পারে।
জামায়াতের যুক্তি: স্থানীয় নির্বাচন কেন্দ্রীয় সমঝোতায় সম্ভব নয়
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ভিন্ন। দলটির নেতারা মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো সীমিত সংখ্যক আসনের নির্বাচন নয়। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক পদে কেন্দ্রীয়ভাবে আসন সমঝোতা করা বাস্তবসম্মত নয়।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ ২০ জুলাই বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের সমঝোতা করতেই কয়েক মাস সময় লেগেছিল। স্থানীয় সরকারের হাজারো পদে একই ধরনের সমঝোতা কার্যকর করা সম্ভব নয়। অতীতেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন জোটগতভাবে হয়নি।
তবে তিনি বলেন, কোনো এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতা হলে কেন্দ্রীয়ভাবে তাতে বাধা দেওয়া হবে না।
জামায়াতকে বাদ দিয়ে বিকল্প জোট গঠনের আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, এ ধরনের কোনো আলোচনার বিষয়ে তাঁর জানা নেই। পরিস্থিতি তৈরি হলে তখন বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
সংসদ নির্বাচনের অসন্তোষ এখনো কাটেনি
জোট-সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভাষ্য, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে আসন সমঝোতা হলেও কয়েকটি শরিক দল প্রত্যাশার তুলনায় কম আসন পাওয়ায় অসন্তুষ্ট ছিল। বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে তারা আপস করলেও সেই অসন্তোষ পুরোপুরি দূর হয়নি।
সবচেয়ে বেশি অসন্তোষ ছিল মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ ও আহমদ আবদুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিসে। দলটির দাবি ছিল, তাদের আরও বেশি আসন দেওয়া উচিত ছিল। পাশাপাশি সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিনিধিত্ব না পাওয়ায় তারা মনে করছে, জোটে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৫ জুলাই খেলাফত মজলিস ঘোষণা দেয়, তারা আর ১১–দলীয় ঐক্যের কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেবে না।
বিকল্প সমঝোতার চিন্তায় খেলাফত মজলিস
খেলাফত মজলিসের নেতারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রথমে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করা হবে। তবে সেটি সম্ভব না হলে দুটি বিকল্প পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথমত, এককভাবে নির্বাচন করা এবং দ্বিতীয়ত, জামায়াতের বাইরে সমমনা কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচন করা।
তাদের দাবি, এ বিষয়ে আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও চায় জোটগত নির্বাচন
মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগত সমন্বয়ের পক্ষে।
দলটির এক যুগ্ম মহাসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জামায়াত যদি এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেটি দ্রুত স্পষ্ট করা উচিত। সে ক্ষেত্রে তারা অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগ নেবেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তারা জোটবদ্ধভাবে অংশ নিতে চান। তবে জামায়াত আলাদা পথে গেলে বিকল্প কৌশল নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এবি পার্টির ধারণা
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১১–দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় সমন্বয় হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে জেলা, উপজেলা বা নির্দিষ্ট এলাকায় স্থানীয় বাস্তবতায় সমঝোতা হতে পারে।
এনসিপির অবস্থান: আপাতত একক প্রস্তুতি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে।
দলীয় সূত্র জানায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে। তিনি এ পদে জামায়াতের সমর্থন প্রত্যাশা করছেন বলে জানা গেছে।
তবে একই পদে জামায়াত ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েমকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুত করছে। ফলে ঢাকা দক্ষিণে দুই দলের সমঝোতার সম্ভাবনা আপাতত কম বলেই সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
জোট-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এনসিপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ হয়েছে।
এ বিষয়ে মামুনুল হক বলেন, আসিফ মাহমুদ তাঁর নির্বাচনী কার্যক্রমে সহযোগিতা চেয়ে যোগাযোগ করেছিলেন। তবে এনসিপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্বাচনী জোট বা সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হয়নি।
যদিও এর আগে আসিফ মাহমুদ বলেছেন, মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো এবং দুই পক্ষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
তফসিলের পরই পরিষ্কার হবে চিত্র
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব জানিয়েছেন, দলটি আপাতত এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের পরিচিতি বাড়ানো এবং সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য।
তবে তফসিল ঘোষণার আগে বা পরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনসহ কিছু এলাকায় সমঝোতার প্রয়োজন হলে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
এদিকে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সূত্র বলছে, আগস্টের শেষ দিকে অথবা সেপ্টেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে উপজেলা, সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
যদিও এখনো কোনো দলই চূড়ান্ত নির্বাচনী কৌশল ঘোষণা করেনি, তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১১–দলীয় ঐক্যের শরিকদের মধ্যে যে কৌশলগত পার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। তফসিল ঘোষণার পর এই ভিন্ন অবস্থানের বাস্তব প্রতিফলন নির্বাচনী মাঠে কতটা দেখা যায়, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচনার বিষয়।