ঢাকা

ট্রাম্প কেন চুক্তিতে গেলেন, নেপথ্যে কী আশঙ্কা—নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরান যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে—মাত্র ১৫ সপ্তাহ আগে এ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিলেন দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে। তখন তাঁর ঘোষণা ছিল, “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না।”

কিন্তু বুধবার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারক সেই অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছে নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ। চুক্তিটি কোনো “আত্মসমর্পণের দলিল” নয়; বরং একটি জটিল কূটনৈতিক সমঝোতা, যেখানে উভয় পক্ষই লাভ–ক্ষতি ভাগ করে নিয়েছে।

যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে এসে লাভবান ইরান?

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান শুধু সংঘাত থেকে টিকে বের হয়নি, বরং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—শত শত কোটি ডলারের তেল বিক্রির সুযোগ পুনরুদ্ধার। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানি অর্থনীতির জন্য এটি বড় ধরনের স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চুক্তি অনুযায়ী, জব্দ থাকা ইরানি সম্পদের একটি বড় অংশও মুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা দেশটির আর্থিক সংকট কিছুটা কমাতে পারে।

ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য বনাম বাস্তবতা

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর সময় বারবার বলেছিলেন, তাঁর লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা এবং প্রয়োজনে সরকারের পতন ঘটানো।

কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ বলছে, বাস্তবে সেই লক্ষ্যগুলোর কোনোটি পূর্ণ হয়নি। বরং ইরান এখন আরও সংগঠিতভাবে আলোচনার টেবিলে ফিরে এসেছে।

ট্রাম্প নিজেও সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, এই চুক্তি আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে।

হরমুজ প্রণালি ও নতুন কৌশলগত সমীকরণ

সমঝোতা স্মারকে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে যে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরান একটি “স্থায়ী সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ” প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা চাইতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ নিয়ে ইরানের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

রাজনৈতিক চাপ ও চুক্তির সমালোচনা

চুক্তিটি ঘোষণার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

ট্রাম্পের নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থীরা এই সমঝোতাকে দুর্বল বলে সমালোচনা করছেন। একই সঙ্গে ইসরায়েল সরকারও আপত্তি জানিয়েছে, বিশেষ করে লেবানন ও হিজবুল্লাহবিষয়ক সামরিক অভিযানের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

ইসরায়েলের আশঙ্কা, এই চুক্তি তাদের আঞ্চলিক সামরিক কৌশলকে সীমিত করতে পারে।

যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র শত শত কোটি ডলার ব্যয় করেছে। পাশাপাশি প্রাণহানির দিক থেকেও বড় ক্ষতি হয়েছে—প্রায় ১৩ জন মার্কিন সেনা এবং ৩ হাজারের বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন।

এই পরিসংখ্যান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উদ্বেগ

বিশ্লেষণে বলা হয়, যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার পেছনে ট্রাম্পের একটি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভয়ও কাজ করেছে।

তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি চান না তাঁর নাম যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও মন্দার সঙ্গে যুক্ত হোক, যেমনটি হয়েছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভারের ক্ষেত্রে।

ট্রাম্প বলেন, তিনি এমন পরিস্থিতি এড়াতে চেয়েছেন, যেখানে যুদ্ধ অর্থনৈতিক সংকট ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।

জ্বালানি বাজারে চাপ ও ইরানের কৌশল

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান সংঘাত চলাকালে অত্যন্ত কার্যকরভাবে তেলবাজারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।

হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা সৃষ্টি, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ সৃষ্টি—এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে উদ্বেগ তৈরি করে।

এই চাপই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশের মত।

ধীর ও দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া

চুক্তি বাস্তবায়ন এখন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার দিকে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, আলোচনা ৬০ দিনের বেশি সময় চলতে পারে। পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক জ্বালানি ও অবকাঠামো নিয়ে এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

উত্তর কোরিয়া অভিজ্ঞতার ছায়া

বিশ্লেষণে উত্তর কোরিয়ার উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র অতীতেও একই ধরনের কৌশলে ব্যর্থ হয়েছে। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে চাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত স্থায়ী ফল দেয়নি।

উত্তর কোরিয়া বরং পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে নিজ অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।

এই অভিজ্ঞতাই ইরান প্রসঙ্গে নতুন আশঙ্কা তৈরি করছে—চুক্তি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে?

চূড়ান্ত প্রশ্ন: বিজয় নাকি কৌশলগত পিছু হটা?

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এই চুক্তিকে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে এটি একটি আপস-ভিত্তিক সমঝোতা, যেখানে উভয় পক্ষই কিছু লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, অন্যদিকে ইরান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বস্তি পেয়েছে।

সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন ঘিরে—এই চুক্তি কি দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে, নাকি নতুন করে সংঘাতের পথ খুলে দেবে—সে প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স