ঢাকা

রাশিয়ায় ইউক্রেনের বড় ড্রোন অভিযান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্য—সিএনএন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো মস্কোকে লক্ষ্য করে সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত চালানো এই হামলায় রাশিয়ার রাজধানী ও আশপাশের অঞ্চলজুড়ে ব্যাপক বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড এবং অবকাঠামোগত ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে রুশ কর্তৃপক্ষ। ইউক্রেনীয় বাহিনী এই হামলাকে রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলার “প্রতিশোধমূলক জবাব” হিসেবে উল্লেখ করেছে।

রাশিয়ার দাবি: শতাধিক ড্রোন ধ্বংস

মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, রাজধানীর দিকে আসা অন্তত ১৯৪টি ড্রোন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গুলি করে ভূপাতিত করেছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু মস্কো নয়, আজভ সাগরসহ বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা প্রতিহত করা হয়েছে, যার মোট সংখ্যা ৫৫৫টি।

রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই হামলার ফলে বিভিন্ন স্থানে আগুন ধরে যায় এবং ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী অঞ্চলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। মস্কোর সব প্রধান বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজ ওঠানামা বন্ধ রাখা হয় কয়েক ঘণ্টার জন্য।

তেল শোধনাগারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত

ইউক্রেনের লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল মস্কোর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কাপোতনিয়া জেলার একটি বড় তেল শোধনাগার। ক্রেমলিন থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের এই স্থাপনাটি এর আগেও হামলার শিকার হয়েছিল বলে জানিয়েছে রুশ গণমাধ্যম।

মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিয়ভ জানিয়েছেন, হামলায় অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া আশপাশের এলাকায় অবকাঠামোগত ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলের একটি তেল ডিপো এবং ইউক্রেনের রুশ দখলকৃত অঞ্চলের দুটি সেতুতেও হামলা চালিয়েছে।

ইউক্রেনের দাবি: “ন্যায্য জবাব”

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ন্যাটো নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিতে ব্রাসেলসে অবস্থানকালে টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে এই হামলাকে “ন্যায্য প্রতিক্রিয়া” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এটি রাশিয়ার ইউক্রেনীয় শহর ও জনপদে চলমান হামলার পাল্টা জবাব।

জেলেনস্কি দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রাশিয়ার সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোতে চাপ সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, “আমাদের আঘাত এখন আরও নির্ভুল ও কার্যকর হচ্ছে।”

রাশিয়ার পাল্টা হামলা

ড্রোন হামলার জবাবে রাশিয়াও ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে পাল্টা আঘাত হেনেছে। ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর তথ্যমতে, রাশিয়া ৭টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২৩৯টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।

এই হামলায় কিয়েভ ও পোলতাভা অঞ্চলে একটি ব্যক্তিগত বাড়ি, একটি জ্বালানি অবকাঠামো, একটি হ্যাঙ্গার এবং একটি তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

ন্যাটো ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি

এই হামলা এমন সময় হলো যখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ব্রাসেলসে ন্যাটো নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং ইউরোপীয় মিত্রদের কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নতি করছে। তিনি জানান, রাশিয়া প্রতি মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার সেনা হতাহত হচ্ছে—যা যুদ্ধের তীব্রতা নির্দেশ করে।

এর আগে ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে বিশ্বনেতারা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদারের বিষয়ে একমত হন বলে জানা যায়।

ট্রাম্পের আহ্বান ও যুদ্ধের দীর্ঘায়িত বাস্তবতা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়াকে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের জন্য একটি চুক্তিতে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, উভয় পক্ষই বিপুল ক্ষতির মুখে পড়ছে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া কারও স্বার্থে নয়।

তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত এবং উভয় পক্ষই একে অপরের অবকাঠামো ও সামরিক সক্ষমতা লক্ষ্য করে আক্রমণ জোরদার করছে।

যুদ্ধের নতুন পর্যায়

বিশ্লেষকদের মতে, মস্কোর ওপর এই মাত্রার ড্রোন হামলা যুদ্ধকে নতুন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এতদিন সীমান্ত ও দখলকৃত অঞ্চল কেন্দ্রিক সংঘাত থাকলেও এখন সরাসরি রাশিয়ার রাজধানী ও অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।

এর ফলে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপ আরও বেড়েছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে—যুদ্ধ শেষ হওয়ার চেয়ে বরং নতুন মাত্রায় বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স