মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, এটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে কার্যকর করা হয়েছে।
অবরোধ প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে অঞ্চলটিতে চলমান সামরিক চাপের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটল বলে দাবি করা হলেও চুক্তির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ভিন্নমত এবং ইসরায়েলের কড়া প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
খামেনির ভিন্নমত, অভ্যন্তরীণ অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, শুরুতে তিনি এই চুক্তির পক্ষে ছিলেন না। তবে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের আশ্বাসের পর শেষ পর্যন্ত এতে সম্মতি দেন তিনি। ইরানি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, আলোচনায় যুক্ত কর্মকর্তারা ‘আন্তরিক উদ্বেগ ও সদিচ্ছা’ নিয়ে কাজ করেছেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তির জন্য ‘মরিয়া হয়ে প্রভাব খাটিয়েছেন’।
খামেনি আরও বলেন, এ বিষয়ে তাঁর ‘ভিন্ন মত’ রয়েছে, তবে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা সম্ভাব্য বলে ইঙ্গিত দেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এটি কোনোভাবেই শত্রুর অবস্থান মেনে নেওয়া নয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে পূর্বসূরির মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া।
চুক্তির কাঠামো: যুদ্ধবিরতি, প্রণালি খুলে দেওয়া ও শর্তযুক্ত সুবিধা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
সব ফ্রন্টে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা
আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধ
চুক্তি অনুযায়ী, ইরান তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে না। বরং প্রথম ধাপে তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা সম্পূর্ণভাবে শর্ত মানছে। এর মধ্যে ইউরেনিয়াম মজুত ধ্বংস এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ইরান কোনো অর্থ পাবে না বা নিষেধাজ্ঞা শিথিল হবে না। তিনি জানান, পরবর্তী ৬০ দিন কারিগরি আলোচনা চলবে এবং সুইজারল্যান্ডে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে পাকিস্তান জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে, কারণ চুক্তিটি ইতিমধ্যেই দূরবর্তীভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
ট্রাম্পের অবস্থান ও রাজনৈতিক চাপ
ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অর্জন হিসেবে তুলে ধরলেও এর পেছনে তাঁর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে যুদ্ধ চলতে থাকলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অস্থিরতায় পড়তে পারে।
ট্রাম্প অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভারের উদাহরণ টেনে বলেন, তিনি কোনোভাবেই এমন পরিস্থিতির দায় নিতে চান না যা অর্থনৈতিক ধস ডেকে আনে।
তবে সমালোচকরা মনে করছেন, ইরান যে মূল লক্ষ্যগুলো ছিল—পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং সরকারের পরিবর্তন—তার কোনোটিই অর্জিত হয়নি।
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক সমীকরণ
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময় তাদের পাশে ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ ছিল। তবে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার কিছু সদস্য চুক্তির সমালোচনা করেছেন।
জেডি ভ্যান্স সমালোচকদের উদ্দেশে বলেন, “আপনাদের উচিত বাস্তবতা বোঝা।” তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্রের পক্ষে শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ইসরায়েল-ইরান-হিজবুল্লাহ সংঘাতকে আলাদা প্রেক্ষাপটে দেখা হলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই চুক্তি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তন আনতে পারে।
যুদ্ধের পরিণতি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
প্রায় দুই বছর ধরে চলা সংঘাতে হাজারো প্রাণহানি এবং বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির পর এই সমঝোতা স্বাক্ষরিত হলো। তবে বাস্তবে এটি স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন, আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা এবং ইসরায়েলের অবস্থান—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং একটি নতুন ধাপের সূচনা, যেখানে কূটনীতি ও সংঘাত পাশাপাশি চলতে পারে।