ঢাকা

ইট-পাথরের বাইরে নির্মাণশিক্ষার নতুন অভিজ্ঞতা, উৎসবে মেতে উঠলেন শিক্ষার্থীরা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ধূসর সিমেন্ট, দানাদার বালু আর নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি—এই তিন উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি হলো প্রকৌশলের বহুল ব্যবহৃত নির্মাণ উপকরণ ‘মর্টার’। তবে এটি ছিল না কোনো সাধারণ নির্মাণকাজের প্রস্তুতি; বরং তরুণ প্রকৌশলীদের দক্ষতা, জ্ঞান ও উদ্ভাবনী চিন্তার এক প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের ল্যাবে দেখা যায় এমনই এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। ধাতব পাত্রে পরিমাপ করে ঢালা হচ্ছে সিমেন্ট, বালু ও পানি। মিক্সারের ব্লেড ঘুরে তৈরি করছে সমসত্ত্ব মিশ্রণ। কেউ মিশ্রণের ঘনত্ব পরীক্ষা করছেন, কেউ অনুপাত ঠিক আছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করছেন। নিখুঁত মানের মর্টার তৈরির এই প্রচেষ্টায় ব্যস্ত দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

শুক্রবার চুয়েট ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) চুয়েট স্টুডেন্ট চ্যাপটারের দিনব্যাপী আয়োজনে এমন প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি হয়। নির্মাণপ্রযুক্তি, গবেষণা ও শিল্প খাতের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই আয়োজন করা হয় এই অনুষ্ঠানের।

Chittagong University of Engineering & Technology ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। ব্যানার-ফেস্টুনে সাজানো প্রাঙ্গণে কোথাও চলেছে কুইজ প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি, কোথাও গবেষণাভিত্তিক পোস্টার উপস্থাপন। আবার কোনো জায়গায় শিক্ষার্থীরা আলোচনা করেছেন টেকসই নির্মাণসামগ্রী ও ভবিষ্যতের অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে।

আট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ

এসিআই চুয়েট স্টুডেন্ট চ্যাপটারের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশের আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ছিল Bangladesh University of Engineering and Technology (বুয়েট), Ahsanullah University of Science and Technology, Shahjalal University of Science and Technology, University of Asia Pacific, Islamic University of Technology, University of Information Technology and Sciences এবং International University of Business Agriculture and Technology–এর এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপটার।

সকালের শুরুতেই কেন্দ্রীয় মিলনায়তনের করিডরে শিক্ষার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। কুইজ ও বিজনেস কেস প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে নিবন্ধন ডেস্কে দেখা যায় দীর্ঘ সারি। প্রতিযোগিতা শুরু হলে হলরুমে নেমে আসে মনোযোগী পরিবেশ। নির্মাণ খাতের বাস্তব সমস্যা বিশ্লেষণ ও সমাধানের চেষ্টা করেন অংশগ্রহণকারীরা।

একই সময়ে শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা নির্মাণশিল্পের বর্তমান বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এ পর্বে বক্তব্য দেন BSRM, Holcim ও Penta Ocean Construction–এর প্রতিনিধিরা।

উদ্বোধনী আয়োজনে গবেষণার গুরুত্ব

দুপুর ১২টায় অনুষ্ঠিত হয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী পর্ব। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মাহমুদ আব্দুল মতিন ভুইয়া।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন চুয়েট পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক রিয়াজ আকতার মল্লিক, এসিআই বাংলাদেশ চ্যাপটারের সম্পাদক অধ্যাপক রুপক মাতসুদ্দি, সভাপতি তারেক উদ্দিন এবং এসিআই বাংলাদেশ চ্যাপটারের পরিচালক ও চুয়েট এসিআইয়ের অনুষদ উপদেষ্টা অধ্যাপক জি এম সাদিকুল ইসলাম।

বক্তারা বলেন, দেশের নির্মাণ খাতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি করতে গবেষণা, ব্যবহারিক শিক্ষা এবং শিল্প খাতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

মর্টার পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের দক্ষতার লড়াই

আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ছিল ‘মর্টার কার্যক্ষমতা পরীক্ষা প্রতিযোগিতা’। পুরকৌশল বিভাগের ল্যাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত অনুপাতে সিমেন্ট, বালু ও পানি মিশিয়ে মর্টার তৈরি করেন।

কেউ উপাদানের অনুপাত নির্ধারণে ব্যস্ত, কেউ মিশ্রণের গঠন ও মান পর্যবেক্ষণ করছেন। বিচারকদের সামনে নমুনা জমা দেওয়ার আগে প্রতিটি দল নেয় শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

বাস্তব নির্মাণকাজে ব্যবহৃত মর্টারের কার্যকারিতা, স্থায়িত্ব ও গুণগত মান নির্ধারণের বিষয়গুলোকে শিক্ষার্থীদের সামনে বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তুলে ধরাই ছিল এই প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য।

টেকসই নির্মাণসামগ্রী নিয়ে আলোচনা

প্রতিযোগিতা শেষে অনুষ্ঠিত হয় টেকসই নির্মাণসামগ্রী বিষয়ক বিশেষ সেমিনার ও প্রশ্নোত্তর পর্ব। এতে অংশ নেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আ ফ ম সাইফুল আমিন এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক আহমেদ।

তাঁরা পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী, নতুন গবেষণার ক্ষেত্র এবং ভবিষ্যতের অবকাঠামো উন্নয়নে উদ্ভাবনী প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

জ্ঞান বিনিময়ে মুখর পোস্টার প্রদর্শনী

দিনের শেষ ভাগে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপটার নিজেদের কার্যক্রম, অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে। পোস্টার প্রদর্শনীর সামনে শিক্ষার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।

একটি দলের গবেষণা সম্পর্কে জানতে অন্য দলের শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করছেন, নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করছেন এবং নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা করছেন। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের এই পরিবেশ আয়োজনটির অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়।

চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মাহমুদ আব্দুল মতিন ভুইয়া বলেন, বাস্তব অভিজ্ঞতা, গবেষণা এবং শিল্প খাতের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমেই একজন দক্ষ প্রকৌশলী গড়ে ওঠেন। এ ধরনের আন্তবিশ্ববিদ্যালয় আয়োজন শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে।

চুয়েট এসিআইয়ের অনুষদ উপদেষ্টা অধ্যাপক জি এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত প্রস্তুতি আরও সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করে। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়লে প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা আরও বেশি উপকৃত হবেন।

আয়োজনে অংশ নেওয়া ইসলামী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাইসা চৌধুরী বলেন, পুরো আয়োজনটি ছিল সুশৃঙ্খল ও শিক্ষণীয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পাওয়া গেছে।

বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার মাহমুদ বলেন, মর্টার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বাস্তব প্রকৌশল জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হয়েছে। আয়োজনের ব্যবস্থাপনাও ছিল প্রশংসনীয়।

এসিআই চুয়েটের সভাপতি আসহাব লাবিব বলেন, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা একে অপরের সঙ্গে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পান। পাশাপাশি বাস্তব প্রকৌশল সমস্যার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ভবিষ্যৎ প্রকৌশলীদের গবেষণা, উদ্ভাবন ও শিল্প খাতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করাই এসিআইয়ের অন্যতম লক্ষ্য।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স