ঢাকা

‘আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য’—জামায়াত আমিরের বক্তব্যে নতুন আলোচনা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও সম্মানজনক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য ‘আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের’ জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এসেছে। তাঁর ভাষায়, এই বিপ্লব কোনো দল বা পরিবারকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়, বরং একটি শোষণমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যেই হবে।

শনিবার বিকেলে খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ লাঘব এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সমাবেশের আয়োজন ঘিরে দুপুর থেকেই খুলনা শহরে রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থকদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বিভিন্ন জেলা থেকে আগত নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণে সার্কিট হাউস ময়দান কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

‘জনরায়কে সম্মান না করার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে’

বক্তব্যে শফিকুর রহমান প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে বিএনপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিল, সেই প্রত্যাশা তারা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা বলেছি, আপনারা ভুল করছেন। ভুল সংশোধন করে জনগণের কাতারে আসুন। জনরায়কে সম্মান না করলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।”

বিএনপিকে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, বারবার সতর্ক করার পরও যদি রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষা না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে জনগণই এর জবাব দেবে।

‘মাঠে মাঠে আন্দোলনের বার্তা’

শফিকুর রহমান তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রয়োজন হলে জনগণ মাঠে নেমে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করবে।

তিনি বলেন, “যদি ফয়সালা সংসদে না হয়, তাহলে যেখানে স্পিকারের অনুমোদন লাগে না, সেই মাঠ থেকেই জনগণ তাদের বক্তব্য দেবে। খুলনা, বরিশাল, কুমিল্লা, সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী—সব জায়গা থেকেই আন্দোলনের ঢেউ উঠবে।”

তাঁর ভাষায়, এই আন্দোলন কোনো ধ্বংসাত্মক শক্তি নয়, বরং “অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনতার গণপ্রতিরোধ”।

আধিপত্যবাদ ও সীমান্ত ইস্যু নিয়ে মন্তব্য

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)–এর পুশ–ইন ইস্যু নিয়েও বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করবে না।

তিনি সরকারকে সতর্ক করে বলেন, সীমান্ত ইস্যুতে নতজানু অবস্থান গ্রহণ করা হলে জনগণ তা মেনে নেবে না।

তিনি আরও বলেন, দেশের জনগণ এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী একসঙ্গে কাজ করছে এবং দেশের স্বার্থ রক্ষায় তারা সর্বদা প্রস্তুত।

তবে একই সঙ্গে তিনি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে কড়া বক্তব্য

সমাবেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে শফিকুর রহমান কঠোর ভাষায় বক্তব্য দেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সময়ের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অর্থনৈতিক খাতে অনিয়ম হয়েছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।

তিনি বলেন, “দেশের মানুষকে নির্যাতন করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে, অর্থ পাচার হয়েছে। কিন্তু এসবের কোনো অনুশোচনা নেই।”

রাজনৈতিক সংস্কার ও গণভোট প্রসঙ্গ

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সরকার ক্ষমতায় গিয়ে তা থেকে সরে এসেছে।

তিনি দাবি করেন, গণভোটে জনগণ যে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকার অনীহা দেখাচ্ছে এবং এর ফলে রাষ্ট্রে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বাড়ছে।

অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য

সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। তবে এখনো সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের অগ্রগতি নিয়ে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

১১–দলীয় জোটের উপস্থিতি

সমাবেশে ১১–দলীয় রাজনৈতিক জোটের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।

এছাড়া বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, খেলাফত মজলিস, জাগপা, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতারাও বক্তব্য দেন।

রাজনৈতিক বার্তা ও ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত

সমাবেশে বক্তারা রাষ্ট্র সংস্কার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জনদুর্ভোগ লাঘব এবং রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেন। তবে শফিকুর রহমানের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ‘আরেকটি বিপ্লবের প্রস্তুতি’–সংক্রান্ত মন্তব্য, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য দেশের চলমান রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়াতে পারে এবং আসন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতিপথ তৈরি করতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স