হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল বন্ধের ঘোষণা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক সমঝোতার অগ্রগতির মধ্যেই লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ। তবে দখলকৃত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি গণমাধ্যম।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সামরিক অভিযান ‘হ্রাস বা স্থগিত’ করার নির্দেশ এলেও লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
এদিকে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে চলমান ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে অন্তত ৪ হাজার ৫৭ জন নিহত এবং ১২ হাজার ১২১ জন আহত হয়েছেন। হতাহতদের বড় অংশই দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দা।
হরমুজে ইরানের পদক্ষেপে উত্তেজনা বৃদ্ধি
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। দেশটির সামরিক কমান্ডের কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর খাতাম আল-আনবিয়া এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে এটিকে ‘প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনায় নতুন দফা, মধ্যস্থতায় পাকিস্তান ও কাতার
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কাঠামো নিয়ে স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে আগামীকাল রোববার সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে টেকনিক্যাল পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তান ও কাতারের কর্মকর্তারাও অংশ নেবেন।
সমঝোতা স্মারকের ১৪ দফার প্রথম অনুচ্ছেদেই লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি তার বিপরীত পথে যাচ্ছে—লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে। এতে করে চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডে উচ্চপর্যায়ের প্রস্তুতি বৈঠক
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যে সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
দলটিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ছাড়াও রয়েছেন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং তেল খাতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আলোচনায় যোগ দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এই বৈঠককে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিরসনের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষণ: যুদ্ধ ও কূটনীতির সমান্তরাল চাপ
বিশ্লেষকেরা বলছেন, একদিকে লেবাননে চলমান হামলা ও অন্যদিকে হরমুজ সংকট—এই দুই চাপ যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনাকে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় ফেলেছে। যুদ্ধবিরতির কাঠামো কার্যকর রাখার জন্য যে আস্থা প্রয়োজন, তা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
নেতানিয়াহুর সামরিক অভিযানে ‘আংশিক বিরতি’ ঘোষণা তাই একদিকে যেমন সাময়িক প্রশমন হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে এটি কূটনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার কৌশল বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এখন এক অস্থির ভারসাম্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে যুদ্ধ, কূটনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে।