ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির এক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, “আজ হোক বা কাল, ইসরায়েলকে সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে হবে।” তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যেখানে তিনি একটি কথিত “ইসরায়েলবিরোধী জোট” গঠনের অভিযোগও তুলেছেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি বলেন, সিরিয়ায় বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পরিবর্তন ইসরায়েলের জন্য নতুন নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছে। তাঁর দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে একটি “উগ্র সুন্নি অক্ষ” ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে।
এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে Middle East Eye।
সিরিয়া নিয়ে কঠোর অবস্থান
সাক্ষাৎকারে আমিচাই চিকলি সিরিয়ার বর্তমান নেতৃত্বকে ইঙ্গিত করে বলেন, দেশটিতে যে সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, তারা তাঁর মতে “আইএস ও আল-কায়েদার আদর্শে অনুপ্রাণিত একটি জিহাদি শাসনব্যবস্থা” পরিচালনা করছে।
তিনি বলেন, “যে শক্তিগুলো জেরুজালেম দখলকে লক্ষ্য হিসেবে দেখে, তারা কখনো ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকতে পারবে না।”
চিকলির মতে, সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তন শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করছে।
‘নতুন জোট’: পাকিস্তান, তুরস্ক ও কাতার নিয়ে অভিযোগ
বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি আর্মি রেডিওতে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে চিকলি দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন “ইসরায়েলবিরোধী জোট” তৈরি হচ্ছে, যেখানে পাকিস্তান, তুরস্ক ও কাতার একসঙ্গে কাজ করছে।
তিনি বলেন, এই তিন দেশ একত্রিত হয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক-সামরিক ব্লক তৈরি করেছে, যা ইসরায়েলের জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক।
তাঁর ভাষায়, “আমরা একটি নতুন অক্ষের উত্থান দেখছি, যা আগের যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি বিপজ্জনক।”
তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আলোচনায় এই দেশগুলোর ভূমিকা রয়েছে এবং এর মাধ্যমে তারা এই নতুন জোটের অংশ হয়ে উঠেছে।
কাতারকে ‘জনসংযোগ শাখা’ হিসেবে আখ্যা
আরেকটি রেডিও সাক্ষাৎকারে চিকলি কাতারের ভূমিকাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেন। তিনি দেশটিকে “জিহাদিদের জনসংযোগ শাখা” হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই মন্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, কারণ কাতার মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালন করে আসছে।
তুরস্ককে কেন্দ্র করে বাড়তি উদ্বেগ
চিকলির বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তুরস্ক প্রসঙ্গ। তিনি দাবি করেন, তুরস্কের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি বলেন, তুরস্ক সিরিয়ায় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে “একটি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল” গড়ে তুলছে, যা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ।
চিকলির ভাষায়, “তুরস্ক ও সিরিয়া আমাদের জন্য ইরানের চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয়।”
এই মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন বাড়ছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান একাধিকবার ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে সমালোচনা করেছেন এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
পশ্চিমা রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ বক্তব্য
চিকলি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পশ্চিমা রাজনীতিতেও সমালোচনামূলক মন্তব্য করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের কট্টর ডানপন্থী কর্মী টমি রবিনসনের প্রসঙ্গে কথা বলেন এবং ব্রিটেনের সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
তাঁর দাবি, ইউরোপে কিছু দেশ “ইসলামি উগ্রবাদ” মোকাবিলার ক্ষেত্রে দুর্বল অবস্থান নিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
অন্যান্য ইসরায়েলি নেতাদের অবস্থান
তুরস্ককে নিয়ে কঠোর অবস্থান শুধু চিকলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। লিকুদ পার্টির আরও কয়েকজন নেতা সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ককে “শত্রু রাষ্ট্র” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও অতীতে তুরস্ককে “নতুন ইরান” বলে মন্তব্য করেছিলেন।
এই ধারাবাহিক বক্তব্য ইসরায়েলি রাজনীতিতে তুরস্ককে ঘিরে ক্রমবর্ধমান সন্দেহ ও উত্তেজনার ইঙ্গিত দেয়।
শান্তি প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
বৃহস্পতিবার এক প্রশ্নের জবাবে চিকলি বলেন, তিনি আঞ্চলিকভাবে শান্তিপূর্ণ সময় প্রত্যাশা করেন, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আশঙ্কা করেন।
তিনি বলেন, “শত্রু যখন কিছু বলে, আমি তা মনোযোগ দিয়ে শুনি”—এই নীতিতেই তিনি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণ করেন।
আঞ্চলিক উত্তেজনার নতুন পর্ব?
বিশ্লেষকদের মতে, চিকলির এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। সিরিয়া, তুরস্ক, কাতার ও পাকিস্তানকে একত্রে একটি ব্লকে উপস্থাপন করার এই দাবি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীন ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে বিষয়টি মূলত রাজনৈতিক বক্তব্য ও কৌশলগত বয়ান হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের জোট রাজনীতিতে নতুন প্রভাব ফেলতে পারে।