এনবিসি নিউজ, ইউএসএনআই নিউজ ও অন্যান্য সূত্র
ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলা সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন–এর প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও সেনাসদস্য চরম মানসিক চাপ, ক্লান্তি ও হতাশার মধ্যে রয়েছেন বলে তাঁদের পরিবার ও সহকর্মীরা জানিয়েছেন। টানা প্রায় ২৫০ দিন সমুদ্রে অবস্থান, এর মধ্যে প্রায় ৪০ দিন সরাসরি যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহণ এবং কবে দেশে ফিরতে পারবেন সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
নাবিকদের পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক বিশ্রামের সুযোগ না পাওয়া, পরিবার-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগে বিঘ্ন, খাদ্য ও পানির সংকট এবং একটানা দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে অনেকের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কয়েকজন নাবিক আত্মহত্যার চিন্তার কথা পরিবারকে জানিয়েছেন। এমনকি একজন নাবিককে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া থেকে আটকানোর ঘটনাও ঘটেছে বলে সহকর্মীরা দাবি করেছেন।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগোতে নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এক টাউন হল সভায় বিষয়টি সরাসরি তুলে ধরেন নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা। সেখানে উপস্থিত প্রায় ২০০ মানুষের সামনে এক নাবিকের স্ত্রী জানান, সভার দিনই তাঁর স্বামীর কাছ থেকে এমন একটি বার্তা পেয়েছেন, যা তাঁকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তাঁর স্বামী লিখেছিলেন, ‘তিনি আশা করেন আগামীকাল যেন তাঁর আর ঘুম না ভাঙে।’
পরিবারটির দাবি, নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে এ কথা তুলে ধরার পরও ওই বক্তব্যের বিষয়ে তাঁরা সরাসরি কোনো জবাব দেননি। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধজাহাজে নাবিকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, চ্যাপলিন ও অন্যান্য সহায়তা ব্যবস্থা রয়েছে। পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আরও মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
টানা ২৫০ দিন সমুদ্রে, ৪০ দিন সরাসরি যুদ্ধ
আব্রাহাম লিংকনের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে দীর্ঘ সময় ধরে চলা মোতায়েন। মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের অধীনে রণতরিটির নাবিকদের প্রায় ৪০ দিন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাভিযানে অংশ নিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে টানা প্রায় ২৫০ দিন সমুদ্রে কাটিয়েছেন তাঁরা।
গত বছরের নভেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে সান ডিয়েগো ছেড়েছিল রণতরিটি। পরে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক পরিস্থিতির অবনতির কারণে সেটির গন্তব্য পরিবর্তন করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে আরব সাগর ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী মে মাসের দিকে মিশন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা পরে বাড়ানো হয়। এখনো নাবিকদের দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি। আর এই অনিশ্চয়তাই পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে বলে পরিবারের সদস্যরা মনে করছেন।
সামরিক সংবাদমাধ্যম ইউএসএনআই নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ১৬২ দিনের একটি মোতায়েন শেষে দেশে ফেরার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে আব্রাহাম লিংকনকে আবার প্রশান্ত মহাসাগরে পাঠানো হয়েছিল। পরে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
ফলে দীর্ঘ সময়ের মোতায়েনের পাশাপাশি বিশ্রামের স্বাভাবিক চক্রও ভেঙে পড়েছে।
‘আমরা শুধু বাড়ি ফেরার একটি তারিখ চাই’
নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, সামরিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা বা ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়টি তাঁরা বোঝেন। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, আব্রাহাম লিংকনের ক্ষেত্রে মোতায়েনের মেয়াদ অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ হয়ে গেছে।
এক নাবিকের ভাষায়, পুরো মোতায়েনজুড়ে তাঁরা কোনো উল্লেখযোগ্য বিরতি ছাড়াই কাজ করে যাচ্ছেন। শুরুতে বিভিন্ন বন্দরে যাত্রাবিরতি ও বিশ্রামের সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশা তাঁদের মনোবল চাঙা রেখেছিল। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, সেই প্রত্যাশাও কমে এসেছে।
এখন অনেক নাবিক বন্দরে যাওয়ার চেয়েও দ্রুত দেশে ফেরাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।
এক নাবিক বলেন, ‘এই মুহূর্তে আসলে আমাদের আর কোনো প্রত্যাশা নেই। আমরা শুধু বাড়ি ফেরার একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ চাই।’
নৌবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকা বিমানবাহী রণতরিগুলোকে সাধারণত রসদ সংগ্রহ, জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্রুদের বিশ্রামের জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর বন্দরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু আব্রাহাম লিংকনের বর্তমান মিশনে সেই স্বাভাবিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে বলে নাবিকদের পরিবারগুলোর অভিযোগ।
খাদ্য-পানি সংকটেও পড়েছিলেন নাবিকেরা
পরিবার ও নাবিকদের বক্তব্যে শুধু মানসিক চাপ নয়, যুদ্ধজাহাজের দৈনন্দিন জীবনযাপন নিয়েও নানা সমস্যার কথা উঠে এসেছে।
তাঁদের অভিযোগ, একপর্যায়ে জাহাজে খাবার রেশন করে দিতে হয়েছিল। তৈরি হয়েছিল তীব্র পানির সংকট। এমনকি টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কাপড় ধোয়ার সুযোগও ছিল না বলে কয়েকজন নাবিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্য জানিয়েছেন।
চিঠি ও ডাক যোগাযোগেও সমস্যা তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে না পারা নাবিকদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবে পরিবার ও নাবিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সমস্যার বড় একটি অংশ বর্তমানে সমাধান হয়েছে। জাহাজে খাবার ও পানির সরবরাহও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। ডাক যোগাযোগও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
মার্কিন নৌবাহিনী অবশ্য জানিয়েছে, বর্তমানে জাহাজে পরিষ্কার পানি, সচল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত রসদ সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় সরবরাহের ক্ষেত্রে সামরিকভাবে সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
‘সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভাবছে’—পরিবারের উদ্বেগ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে নাবিকদের মানসিক অবস্থাকে ঘিরে।
গত জুলাইয়ে এক অভিভাবক সামরিক সংবাদমাধ্যম স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসকে দেওয়া এক চিঠিতে জানান, তাঁর ছেলে আব্রাহাম লিংকনে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর দাবি, ছেলে ও তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে কেউ কেউ মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার কথাও ভাবছেন।
ওই অভিভাবক বলেন, একজন বাবা হিসেবে এমন কথা শোনা অত্যন্ত কষ্টকর।
নাবিকদের কয়েকজন সহকর্মীও দাবি করেছেন, কিছুদিন আগে একজন ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া থেকে আটকাতে হয়েছিল। দায়িত্বে থাকা প্রহরীরা তাঁকে বাধা দেন বলে তাঁদের ভাষ্য। ঘটনাটি জাহাজের লাউডস্পিকারে ঘোষণা করে সবাইকে জানানো হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।
বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নাবিকদের মানসিক সুস্থতা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরামর্শ ও অন্যান্য সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
সান ডিয়েগোর সভায় ক্ষোভ পরিবারের
নাবিকদের পরিবারের উদ্বেগ শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় নৌবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে।
সান ডিয়েগোতে আয়োজিত সভায় নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও, নেভাল এয়ারফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল ডগলাস ভেরিসিমো এবং নেভাল সারফেস ফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল জোসেফ কাহিলসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সেখানে এক নারী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনারা আমাদের এবং নেতৃত্বের মধ্যকার বিশ্বাসের জায়গাটি সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।’
পরিবারগুলোর অভিযোগ, তাঁদের প্রিয়জনেরা একদিকে যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে তাঁদের ফেরার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।
তবে সামরিক নিরাপত্তার বিষয়টি উল্লেখ করে সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা আব্রাহাম লিংকনের দেশে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে নাবিকদের স্ত্রীরা জানিয়েছেন।
ওমানে স্বল্প বিরতি, কিন্তু স্বাভাবিক বিশ্রাম নয়
জুলাইয়ের শুরুতে ওমানের একটি বন্দরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি পায় আব্রাহাম লিংকন। এর ফলে কয়েক মাস পর জাহাজে নতুন করে রসদ নেওয়ার সুযোগ হয়। দীর্ঘ সময় পর নাবিকেরা তাজা ফল ও সবজি পাওয়ার কথা জানান।
তবে এই যাত্রাবিরতিও পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল না। অনেক নাবিককে জাহাজ থেকে নামার অনুমতি দেওয়া হলেও তাঁদের বন্দর এলাকার নির্দিষ্ট নিরাপত্তাবেষ্টিত অংশের মধ্যেই থাকতে হয়েছে।
এর আগে গত ডিসেম্বরে গুয়ামেও সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেছিল রণতরিটি। কিন্তু তখনও অনেক নাবিক তীরে নামার সুযোগ পাননি বলে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
এক নাবিকের স্ত্রী বলেন, নিজের স্বামীকে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখা তাঁর জন্য অসহনীয় হয়ে উঠছে। তাঁর ভাষায়, মনে হচ্ছে নাবিকেরা ধীরে ধীরে সব ধরনের আশা হারিয়ে ফেলছেন।
যুদ্ধের চাপে রসদ সরবরাহেও অগ্রাধিকার বদল
মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যাখ্যা হলো, আব্রাহাম লিংকন বর্তমানে অত্যন্ত বৈরী ও যুদ্ধসংঘাতপূর্ণ পরিবেশে দায়িত্ব পালন করছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত রসদ সরবরাহকেন্দ্রগুলোও সংঘাতের কারণে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছে না।
এই পরিস্থিতিতে সরবরাহের ক্ষেত্রে খাবারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এরপর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সামগ্রী এবং তারপর চিঠিপত্র বা ডাক সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে বাহিনী জানিয়েছে।
নৌবাহিনীর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুদ্ধজাহাজে এখন পরিষ্কার পানি, কার্যকর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত খাবার রয়েছে। সরবরাহব্যবস্থাও ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে।
কিন্তু নাবিকদের পরিবারের প্রশ্ন, শুধু খাবার ও পানির সরবরাহ স্বাভাবিক করলেই কি দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের সমাধান হবে?
দীর্ঘ মোতায়েনের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পর্ক
নাবিকদের পরিবারের অভিযোগকে একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেও দেখছেন না সামরিক গবেষকেরা।
২০২৫ সালে ‘মিলিটারি মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকা নাবিকদের মানসিক চাপের অন্যতম বড় কারণ হলো পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা।
বিমানবাহী রণতরি, ডেস্ট্রয়ার ও উভচর যুদ্ধজাহাজে কর্মরত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগে সমস্যা এবং মানসিক চাপ কমানোর পর্যাপ্ত সুযোগ না পাওয়াকেও বড় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
অর্থাৎ আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের বর্তমান অভিজ্ঞতার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েন নিয়ে আগের গবেষণার বেশ কিছু মিল রয়েছে।
‘সেখানে কোনো সোম, মঙ্গল বা বুধবার নেই’
মার্কিন নৌবাহিনীতে ২০ বছর দায়িত্ব পালন এবং চারবার মোতায়েনের অভিজ্ঞতা রয়েছে অবসরপ্রাপ্ত চিফ পেটি অফিসার থমাস নাটজম্যানের। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটানোর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, মোতায়েন শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময় জানা না থাকলে নাবিকদের ওপর মানসিক চাপ দ্রুত বাড়তে পারে।
তাঁর ভাষায়, সমুদ্রে থাকার সময় দিন-তারিখের স্বাভাবিক অনুভূতিও একসময় হারিয়ে যায়—‘সেখানে কোনো সোম, মঙ্গল বা বুধবার নেই; প্রতিটি দিনই যেন একটি দিন।’
তিনি বলেন, প্রথমদিকে নাবিকেরা নিজেদের সাধ্যমতো ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু মোতায়েন যত দীর্ঘ হয়, মনোবল ধরে রাখার সেই চেষ্টা একসময় দুর্বল হয়ে যায়। তখন থেকেই মানসিক পরিস্থিতির অবনতি শুরু হতে পারে।
আব্রাহাম লিংকনের বর্তমান পরিস্থিতিতে ঠিক সেই আশঙ্কাই এখন সামনে এসেছে।
নৌবাহিনীর সামনে বড় প্রশ্ন—কবে ফিরবে আব্রাহাম লিংকন?
নৌবাহিনী বলছে, নাবিকদের মানসিক সুস্থতা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং তাঁদের জন্য পরামর্শক, চ্যাপলিন, চিকিৎসক ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজনে আরও মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু নাবিকদের পরিবার বলছে, তাঁদের উদ্বেগের কেন্দ্র শুধু চিকিৎসা বা পরামর্শ নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই দীর্ঘ মোতায়েনের শেষ কোথায়?
যুদ্ধের মিশন যত দীর্ঘ হচ্ছে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতার সময়ও তত বাড়ছে। অনিশ্চিত ফেরার তারিখ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বিশ্রামের ঘাটতি এবং যুদ্ধের ঝুঁকি মিলিয়ে কয়েক হাজার নাবিক এখন নজিরবিহীন চাপের মধ্যে রয়েছেন বলে তাঁদের পরিবারগুলোর দাবি।
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে কতটা সফল হচ্ছে, সেটি নিয়ে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক ও সামরিক বিতর্ক চলবে। কিন্তু আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের ক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—একটি যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে তার সঙ্গে যুক্ত সেনাসদস্যদের শারীরিক ও মানসিক সীমারেখা কতদূর পর্যন্ত ঠেলে দেওয়া যায়?
বর্তমান পরিস্থিতিতে নৌবাহিনীর জন্য সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু সামরিক কৌশলের বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে কয়েক হাজার নাবিকের নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং তাঁদের পরিবারের আস্থার প্রশ্নও।