দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার জনপ্রিয় তারকা বিজয় বরাবরই ছিলেন কিছুটা রহস্যময় স্বভাবের। গণমাধ্যমে খুব কম দেখা যায় তাঁকে, সাক্ষাৎকারও দেন হাতে গোনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁর উপস্থিতি সীমিত। তাই যখন তিনি রাজনীতিতে পূর্ণমাত্রায় নাম লেখালেন, তখন অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। তবে সেই বিস্ময়কে বাস্তবে রূপ দিয়ে তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে এখন তিনি রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
চলচ্চিত্র পরিবারের সন্তান
বিজয়ের বেড়ে ওঠা সিনেমার আবহেই। তাঁর বাবা এস এ চন্দ্রশেখর ছিলেন তামিল চলচ্চিত্রের পরিচিত নির্মাতা। বাবার পরিচালনায় ১৯৮৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু হয় তাঁর। সেই সময় অভিনয়ের পারিশ্রমিক ছিল মাত্র ৫০০ রুপি। ছোট্ট সেই পারিশ্রমিকই পরবর্তীতে ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম বড় সাফল্যের গল্পের সূচনা করে।
পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের মতে, ছোটবেলাতেই বিজয় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, একদিন তিনি তামিলনাড়ুর নেতৃত্বে আসবেন। বহু বছর পর সেই স্বপ্নই বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
পারিশ্রমিকের বিস্ময়কর উত্থান
শিশুশিল্পী হিসেবে কয়েকশ রুপি পাওয়া বিজয় পরবর্তীকালে ভারতের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতাদের একজন হয়ে ওঠেন। তাঁর শেষ চলচ্চিত্র হিসেবে আলোচিত ‘জন নায়গন’-এর জন্য তিনি শতকোটি রুপিরও বেশি সম্মানী নিয়েছেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। অভিনয়জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর আর্থিক উত্থান ভারতীয় বিনোদন জগতের অন্যতম বড় সাফল্যের উদাহরণ।
জনপ্রিয়তার মোড় ঘোরানো সময়
নব্বইয়ের দশকে ধীরে ধীরে পরিচিতি পেলেও ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ঘিল্লি’ তাঁকে ঘরের নাম বানিয়ে দেয়। এরপর একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমায় অভিনয় করে তিনি ‘মাস হিরো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।
তাঁর চলচ্চিত্রে শুধু বিনোদন নয়, সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উঠে এসেছে। কৃষকের সংকট, স্বাস্থ্যসেবার দুর্নীতি, নারী ক্ষমতায়নসহ নানা প্রসঙ্গ তাঁর সিনেমার গল্পে জায়গা পেয়েছে। ফলে দর্শকের কাছে তিনি কেবল অভিনেতা নন, সামাজিক বার্তার বাহক হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেন।
তামিল সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে জনপ্রিয়তা
অন্য অনেক তারকা যখন সর্বভারতীয় বাজারকে লক্ষ্য করে কাজ করেছেন, বিজয় দীর্ঘ সময় তামিল ভাষার সিনেমাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তবু তাঁর জনপ্রিয়তা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর একাধিক সিনেমা বিশ্বব্যাপী শত শত কোটি রুপি আয় করে বক্স অফিসে বড় সাফল্য অর্জন করেছে।
রাজনীতির পথে যাত্রা
রাজনীতিতে প্রবেশের প্রস্তুতি অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সিনেমার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক ইঙ্গিত পাওয়া যেত। ধীরে ধীরে ভক্তগোষ্ঠী সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ নেয় এবং সমাজের নানা ইস্যুতে সক্রিয় হতে শুরু করে।
তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষাব্যবস্থা, দুর্নীতি এবং সুশাসনের মতো বিষয় নিয়ে তাঁর অবস্থান নতুন প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এই সমর্থনই পরে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
কেন অভিনয় ছাড়লেন
বিজয়ের মতে, পূর্ণ সময়ের রাজনীতি করতে হলে অন্য পেশার সঙ্গে সমন্বয় করা কঠিন। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেন অভিনয়জীবন শেষ করে পুরোপুরি জনসেবায় মনোযোগ দেওয়ার। তাঁর বিশ্বাস, জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে রাজনীতিকে পেশা নয়, দায়িত্ব হিসেবে নিতে হয়।
এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দীর্ঘ অভিনয়জীবনে সমালোচনা যেমন পেয়েছেন, তেমনি ভক্তদের অগাধ ভালোবাসাও পেয়েছেন। সেই ভালোবাসার প্রতিদান দিতেই জীবনের পরবর্তী অধ্যায় রাজনীতিতে উৎসর্গ করতে চান।
শেষ সিনেমা নিয়ে আগ্রহ
‘জন নায়গন’কে ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ তুঙ্গে। ছবিটি শুধু একটি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নয়, অনেকের মতে এটি বিজয়ের রাজনৈতিক দর্শনেরও প্রতিফলন। মুক্তির আগেই নানা বিতর্ক ও জটিলতার মুখোমুখি হলেও সিনেমাটি নিয়ে ভক্তদের উন্মাদনা কমেনি।
সম্পদের পরিমাণ
নির্বাচনী নথি অনুযায়ী, বিজয়ের সম্পদের পরিমাণ কয়েকশ কোটি রুপি। তাঁর মালিকানায় রয়েছে কৃষিজমি, আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি, ব্যাংক আমানত এবং বিলাসবহুল গাড়ির সংগ্রহ। অভিনয়, বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন উৎস থেকে তাঁর আয় আসে।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও আলোচনা
সাম্প্রতিক সময়ে বিজয়ের ব্যক্তিগত জীবনও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। পারিবারিক সম্পর্ক ও বিচ্ছেদসংক্রান্ত একটি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হলেও বিজয় প্রকাশ্যে এ বিষয়ে খুব বেশি মন্তব্য করেননি।
অভিনেতা থেকে রাজনীতিক—বিজয়ের যাত্রা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। মাত্র ৫০০ রুপি পারিশ্রমিক পাওয়া এক শিশুশিল্পীর রাজ্যের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে পৌঁছে যাওয়ার গল্প যেন বাস্তবের চেয়েও বড় কোনো চলচ্চিত্রের কাহিনি।