ঢাকা

‘বোন, আমি ভেবেছিলাম আমরা মারা যাচ্ছি’—ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পের আতঙ্ক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভূমিকম্পের কয়েক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। সন্ধ্যা নেমেছে, মানুষ দিনের কাজ শেষে ঘরে ফিরেছে। ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ভ্যালেন্তিনা ওরোপেজার মোবাইলে আসে একটি হোয়াটসঅ্যাপ অডিও বার্তা। ওপাশে তাঁর বোন ভেরোনিকার কণ্ঠে আতঙ্ক।

অডিও চালু করতেই শোনা যায়—‘বাড়িটা ভয়ংকরভাবে কেঁপে উঠল, এখনো কাঁপছে।’

ভেরোনিকা তখন ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে তাঁদের মায়ের সঙ্গে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ভ্যালেন্তিনা পেশায় বিবিসির সাংবাদিক। বোনের সেই আতঙ্কভরা কণ্ঠ শোনার পরও তিনি তখন জানতেন না, কয়েক মুহূর্ত আগেই কারাকাস শক্তিশালী এক ভূমিকম্পের আঘাতে কেঁপে উঠেছে।

দূরদেশে বসে উদ্বেগের দুই ঘণ্টা

ভ্যালেন্তিনা সঙ্গে সঙ্গে বোনকে ফোন করেন। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। আবার ফোন করেন। এবারও নীরবতা।

মায়ের ফোনেও একই অবস্থা। একের পর এক ফোন করেও যখন কোনো উত্তর পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন উদ্বেগ ধীরে ধীরে আতঙ্কে পরিণত হয়।

ভ্যালেন্তিনা বলেন, “অডিও বার্তাটি শোনার পরপরই আমি ভেরোনিকাকে ফোন করি। কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি। পরবর্তী দুই ঘণ্টা বোন ও মায়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারিনি।”

এই সময়ের মধ্যে কারাকাসের সাংবাদিকদের একটি চ্যাট গ্রুপে ভূমিকম্পের খবর দেখতে পান তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ধ্বংসস্তূপ, আতঙ্কিত মানুষের ছোটাছুটি এবং উদ্ধার তৎপরতার ছবি ও ভিডিও।

এর মধ্যেই এক বন্ধু তাঁকে একটি ভিডিও পাঠান। ভিডিওতে দেখা যায়, কারাকাসের লস পালোস গ্রান্দেস এলাকার একটি ভবন মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়েছে।

ভিডিওটি দেখে ভ্যালেন্তিনার বুক কেঁপে ওঠে। কারণ ভবনটি তিনি চিনতে পেরেছিলেন। সেটি ছিল তাঁর মা ও বোনের বাসার কাছাকাছি।

তিনি বলেন, “ভবনটি দেখেই আমি চিনতে পেরেছি। মা ও বোন যেখানে থাকে, সেখান থেকে এটি মাত্র কয়েক মিটার দূরে।”

অবশেষে এলো বোনের ফোন

এরপর শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। মুঠোফোনের পর্দায় একের পর এক আসতে থাকে নতুন খবর—কোথাও দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য রাস্তায় নেমে এসেছে, কোথাও উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপে কাজ করছেন।

বিদেশে থাকা অন্য অনেক স্বজনের মতো ভ্যালেন্তিনাও তখন শত শত কিলোমিটার দূরে বসে শুধু একটি ফোনকলের অপেক্ষা করছিলেন।

অবশেষে প্রায় দুই ঘণ্টা পর ভেরোনিকার ফোন আসে। ইন্টারনেট সংযোগ ফিরে পাওয়ার পর তিনি যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন।

ফোনে ভেরোনিকা শুধু একটি কথাই বলতে পেরেছিলেন—
“বোন, আমি ভেবেছিলাম আমরা মারা যাচ্ছি।”

এরপরই ফোন কেটে যায়।

ভূমিকম্পের ধাক্কা থেমে গেলেও আতঙ্ক কাটেনি। ভ্যালেন্তিনা এখনো নিশ্চিত নন, তাঁদের পরিচিত সেই ঘর, সেই আশ্রয় আগের মতো আছে কি না। তবে সবচেয়ে বড় স্বস্তি হলো—দীর্ঘ অপেক্ষার পর অন্তত জানা গেছে, তাঁর মা ও বোন দুজনই বেঁচে আছেন।

শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল ভেনেজুয়েলা

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যার পর শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ভূমিকম্পটি স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপের কাছে। এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২।

এর প্রায় ৩৯ সেকেন্ড পর কারাকাসের পশ্চিমে ইউমারের কাছে আঘাত হানে আরও শক্তিশালী আরেকটি ভূমিকম্প। এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫।

পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।

হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ৩২ জন নিহত এবং প্রায় ৭০০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ইউএসজিএস সতর্ক করে জানিয়েছে, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। সংস্থাটি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে কারাকাসসহ বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসের চিত্র দেখা গেছে। বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কোথাও কোথাও ভবন ধসে পড়েছে।

হাসপাতালগুলোতে আহত মানুষের ভিড় দেখা গেছে। উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।

জরুরি অবস্থা ঘোষণা

ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলার সরকার জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।

ভূমিকম্পের পর কিছু সময়ের জন্য সুনামি সতর্কতাও জারি করা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।

কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যালয় ও রেলসেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে।

আতঙ্কের রেশ রয়ে গেছে

ভূমিকম্পের তাৎক্ষণিক ধাক্কা শেষ হলেও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এখনো কাটেনি। বিশেষ করে বিদেশে থাকা স্বজনদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

ভ্যালেন্তিনার মতো অসংখ্য মানুষ দূরদেশে বসে প্রিয়জনের একটি ফোনকলের অপেক্ষায় ছিলেন। কারও জন্য সেই অপেক্ষা শেষ হয়েছে স্বস্তিতে, আবার কারও জন্য এখনো চলছে অনিশ্চয়তার সময়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স