সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক কূটনৈতিক বৈঠককে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ব্রাজিলের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পেপে এসকোবারের এক সাক্ষাৎকারে করা দাবিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও জল্পনা।
এসকোবার দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে আয়োজিত ওই কূটনৈতিক তৎপরতার সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে হত্যার একটি গোপন পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি শনাক্ত করে এবং সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়।
তবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এ দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। দেশটির একজন উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সুইজারল্যান্ড সফরের সময় এ ধরনের কোনো হুমকি বা নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়নি।
পেপে এসকোবারের দাবি ঘিরে আলোচনা
ব্রাজিলের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পেপে এসকোবার তাঁর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগের আড়ালে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলকে ঘিরে একটি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে লক্ষ্য করে একটি কথিত হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সংশ্লিষ্টতা ছিল।
এসকোবার আরও দাবি করেন, পাকিস্তান বিষয়টি জানতে পেরে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে কঠোর বার্তা দেয় এবং তাদের প্রতিনিধিদলের ওপর কোনো ধরনের হামলা হলে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি জানানো হয়।
তবে এসব দাবির পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা কর্মকর্তার অস্বীকার
এসকোবারের বক্তব্যের পর পাকিস্তানের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বিষয়টিকে নাকচ করে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের সুইজারল্যান্ড সফরের সময় এ ধরনের কোনো হত্যার হুমকি বা নিরাপত্তাজনিত সতর্কতা ছিল না।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, লুসার্ন শহরে অবস্থানকালে সুইজারল্যান্ড বা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও কোনো ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। প্রতিনিধিদলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে অস্বাভাবিক কোনো উদ্বেগও দেখা যায়নি।
পাকিস্তান সরকার বা সামরিক কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো হত্যাচেষ্টার তথ্য নিশ্চিত করেনি।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভূমিকা
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার পর পাকিস্তান কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় অবস্থান নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমানো, আলোচনার পরিবেশ তৈরি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ইসলামাবাদ নিজেকে একটি মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে।
পাকিস্তান একদিকে যেমন আঞ্চলিক শান্তি ও কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছে, অন্যদিকে ইরান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ এবং ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনামূলক অবস্থান প্রকাশ করছে।
এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান পাকিস্তানের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ।
সুইজারল্যান্ড বৈঠকে আলোচনার বিষয়
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টায় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, দেশটির বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব এসব বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
মিত্রদের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা
মধ্যপ্রাচ্যের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
একদিকে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক রয়েছে পাকিস্তানের। অন্যদিকে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে ইসলামাবাদকে একই সময়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন
আসিম মুনিরকে হত্যাচেষ্টার বিষয়ে পেপে এসকোবারের দাবি আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা তৈরি করলেও এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পাকিস্তান সরাসরি এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং কোনো নিরাপত্তা সংস্থা বা সরকারি সূত্র থেকেও এমন কোনো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি।
তবে এ ঘটনা আবারও দেখিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাগুলো কতটা সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তানের জন্য বর্তমান কূটনৈতিক উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার একটি সুযোগ। তবে একই সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করাও দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।