ঢাকা

মামদানির সমর্থকদের জয় নিয়ে নতুন আলোচনা, যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলপন্থী মহলে প্রতিক্রিয়া

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
নিউইয়র্কের সাম্প্রতিক প্রাথমিক নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যু, ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন নীতি এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ অবস্থান নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থন পাওয়া কয়েকজন প্রার্থীর জয়কে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনীতিতে পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, এই ফলাফল দেখাচ্ছে যে দলের একটি বড় অংশ এখন ইসরায়েলপন্থী প্রচলিত অবস্থানের বাইরে গিয়ে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, যুদ্ধবিরোধী অবস্থান এবং মানবাধিকারভিত্তিক রাজনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

তবে এই পরিবর্তন কতটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে ভিন্নমত।

কলাম্বিয়া থেকে কংগ্রেসের পথে আভিলা শেভালিয়ার

নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার এবারের নির্বাচনে বড় চমক তৈরি করেছেন।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে সক্রিয় ভূমিকা রাখা আভিলা শেভালিয়ার গত বছরের নভেম্বরে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। এর আগে খুব কম মানুষই তাঁর নাম জানতেন।

তবে নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেন। অভিবাসনব্যবস্থার কারণে বিচ্ছিন্ন পরিবারগুলোকে একত্র করার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি তিনি ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেন।

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে তিনি দীর্ঘদিনের কংগ্রেস সদস্য আদ্রিয়ানো এসপাইলাতকে পরাজিত করে দলের মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই জয় ছিল এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় অঘটন।

আভিলা শেভালিয়ারের প্রচারণায় সমর্থন দিয়েছিলেন নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি।

মামদানির সমর্থিত প্রার্থীদের ধারাবাহিক সাফল্য

শুধু আভিলা শেভালিয়ার নন, মামদানির সমর্থন পাওয়া আরও কয়েকজন প্রার্থী এবারের প্রাথমিক নির্বাচনে জয় পেয়েছেন।

সাবেক সিটি কমপট্রোলার ব্র্যাড ল্যান্ডার ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছেন। তিনি কট্টর ইসরায়েলপন্থী হিসেবে পরিচিত বর্তমান প্রতিনিধি ড্যান গোল্ডম্যানকে পরাজিত করেছেন।

অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট পার্টির রাজ্য আইনপ্রণেতা ক্লেয়ার ভালদেস একটি শূন্য আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন।

দুই প্রার্থীই ডেমোক্রেটিক পার্টির তুলনামূলক নিরাপদ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। ফলে নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে তাঁদের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

স্থানীয় পর্যায়েও ইসরায়েল সমালোচক কয়েকজন প্রার্থী জয় পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আবের কাওয়াস রয়েছেন, যিনি নিউইয়র্কের প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত সিনেটর হওয়ার পথে এগিয়ে আছেন।

‘ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য বড় সতর্কবার্তা’

ইহুদি সংগঠন জিউইশ ভয়েস ফর পিস (জেভিপি) অ্যাকশনের রাজনৈতিক পরিচালক বেথ মিলার এসব ফলাফলকে নিউইয়র্কের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, এই ফলাফল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

মিলারের মতে, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া শুধু নৈতিক অবস্থান নয়, বরং প্রগতিশীল প্রার্থীদের নির্বাচনে সফল হওয়ার একটি কার্যকর কৌশল হিসেবেও প্রমাণিত হচ্ছে।

তিনি দাবি করেন, ভোটাররা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে প্রচলিত রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানাচ্ছেন।

‘রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তন’

সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হেবা গাওয়ায়েদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কোন বিষয় গ্রহণযোগ্য এবং কোন বিষয় কাঙ্ক্ষিত—সে বিষয়ে একটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে আভিলা শেভালিয়ারের মতো তুলনামূলক নতুন ও প্রগতিশীল প্রার্থীর প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিককে হারানো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

গাওয়ায়েদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সমালোচনাকে রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হলেও এখন সেই অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে।

তিনি বলেন, ভোটাররা এমন প্রার্থীদের সমর্থন করছেন, যারা ফিলিস্তিনি অধিকার, অভিবাসী অধিকার, শ্রমিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের বিষয়গুলোকে সামনে আনছেন।

নিউইয়র্কের বাইরে প্রভাবের সম্ভাবনা

ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠনগুলো মনে করছে, নিউইয়র্কের এই ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের অন্য রাজ্যগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

তারা সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান নেওয়া কয়েকজন প্রার্থীর সাফল্যের উদাহরণ তুলে ধরছে। এর মধ্যে পেনসিলভানিয়ার ক্রিস রাব এবং নিউজার্সির অ্যাডাম হামাওয়ির নাম উল্লেখ করা হচ্ছে।

আভিলা শেভালিয়ার ও ক্লেয়ার ভালদেসের জয়কে অভিনন্দন জানিয়ে ক্রিস রাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, তাঁদের রাজনীতি যুদ্ধ ও অস্ত্রের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেয়।

তিনি বলেন, অভিবাসী, শ্রমজীবী মানুষ ও ভাড়াটিয়াদের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

আইপ্যাকের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী সংগঠন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক) দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন রাজনীতিতে সক্রিয়।

ইসরায়েলপন্থী প্রার্থীদের সমর্থন এবং ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রচারণায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে সংগঠনটির বিরুদ্ধে।

তবে জেভিপি অ্যাকশনের বেথ মিলারের দাবি, সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল দেখিয়েছে যে আইপ্যাকের প্রভাব আগের মতো অপ্রতিরোধ্য নয়।

তিনি বলেন, ফিলিস্তিন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের বিরোধিতা করা এখন অনেক প্রগতিশীল প্রার্থীর নির্বাচনী শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ কংগ্রেসে নতুন সমীকরণ?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৭ সালের শুরুতে নতুন কংগ্রেস অধিবেশন শুরু হলে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান নেওয়া নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংখ্যা বাড়তে পারে।

এতে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় সমর্থনের মধ্যে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে অন্যদিকে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্রিয় থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে নিউইয়র্কের এই নির্বাচন শুধু স্থানীয় রাজনীতির ঘটনা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির ভবিষ্যৎ নীতি, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে মার্কিন অবস্থান এবং তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স